যথাযথ প্রচার, হিসাব ও যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে দেশে কভিড-১৯ অতিমারী ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই ত্রাণ সহায়তা পাননি। আর উচ্চ দারিদ্র্যের অঞ্চলের চেয়ে স্বল্প দারিদ্র্যের অঞ্চলের বেশি মানুষ এই সুবিধার আওতায় ছিল। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরিচিত অনেকেই বারবার ত্রাণ পেয়েছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংক্ষিপ্ত জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ত্রাণও পৌঁছেছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার ‘করোনা ও বন্যা মোকাবিলায় ত্রাণ কর্মসূচি : সরকারি পরিষেবার কার্যকারিতা’ শীর্ষক একটি ভার্চুয়াল সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি সিপিডি ও অক্সফাম বাংলাদেশের উদ্যোগে ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ত্রাণ ও নগদ সহায়তার জন্য তালিকাভুক্ত সুবিবধাভোগীদের টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, যা এই সংলাপে তুলে ধরা হয়। জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী মোস্তফা আমির সাব্বিহ।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অক্সফাম বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. দীপঙ্কর দত্ত, আরডিআরএস বাংলাদেশের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম ও রংপুর জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান।
সংলাপে রংপুর অঞ্চলের কভিড-১৯ অতিমারী ও বন্যা মোকাবিলায় বাস্তবায়িত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে আলোচনা হয়। এতে রংপুরের কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী, এনজিও প্রতিনিধি, ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী, পেশাজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীসহ এ অঞ্চলের নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ এর কারণে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ কর্মহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যা মোট শ্রমশক্তির ২১ শতাংশ। এর মধ্যে সাম্প্রতিক বন্যায় (১২-২১ জুলাই) রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় স্থলভাগের ২৯ শতাংশ তলিয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটেই সরকার বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা, নগদ সহায়তার মতো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক সময় ত্রাণের আড়াই হাজার টাকার জন্য এসএমএস এলেও পরে টাকা আসেনি। যাদের টাকা আসেনি তারা যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। অনেক ক্ষেত্রে অধিক অভাবী ও অতিদরিদ্র মানুষকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে।
সংলাপে সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘কোন প্রক্রিয়ায় কাদের ত্রাণ দেওয়া হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো প্রচারণা মাঠে ছিল না। সে কারণেই অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আবার ত্রাণ বিতরণ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিরও সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক প্রচারণার কথা থাকলেও সরকারি কোনো সংস্থা তা করেনি।’
সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যায় ত্রাণ (চাল ও নগদ সহায়তা) বিতরণের ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক ক্ষেত্রেই পাননি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরিচিত এমন লোকেরা বারবার সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়া বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিতকরণ, চাহিদা নিরূপণের জন্য কোনো সরকারি ত্রাণ কর্মকর্তা সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও এলাকা পরিদর্শন করেননি। করোনাকালেই শুধু নয়, অন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও তারা পরিদর্শন করেন না। দুর্গম চর এলাকায় পরিষদের চেয়ারম্যান যান না। স্বল্প দারিদ্র্যের অঞ্চলে অধিকসংখ্যক পরিবার এই সুবিধার আওতায় ছিল, যেমন- নীলফামারী, চাঁদপুর, গোপালগঞ্জ। আর কুড়িগ্রাম, জামালপুরের মতো উচ্চ দারিদ্র্যের অঞ্চলে কমসংখ্যক পরিবার এই সুবিধার আওতায় ছিল। যেসব এলাকায় বেশিসংখ্যক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে (জামালপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ) সেখানকার কমসংখ্যক পরিবার এই সুবিধার আওতায় ছিল। অন্যদিকে চাঁদপুর ও গোপালগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও ১০০ ভাগের বেশি পরিবার এই সুবিধার আওতায় ছিল। তবে সিপিডির ত্রাণ বিতরণে এসব অনিয়মের অভিযোগ ভার্চুয়াল সংলাপে চ্যালেঞ্জ করেন উপস্থিত কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তা। এসব অনিয়মের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি এনজিওকর্মীরা।