চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—কীভাবে একটি উৎপাদনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও আত্মনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও কৌশলগত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। অবকাঠামো, শিল্প উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, মেডিক্যাল ডিভাইস, ই-কমার্স ও লজিস্টিকস—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীনের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল পণ্য আমদানি বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। প্রয়োজন ‘Trade থেকে Technology, Investment থেকে Industrialization এবং Cooperation থেকে Capacity Building’—এমন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারসাম্যহীনতা। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে এমন শিল্প গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে চীনের সরবরাহ চেইনে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব।

চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শুধু পণ্য বিক্রির বাজার হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে দেখতে উৎসাহিত করতে হবে।

ইলেকট্রনিক্স, মেডিক্যাল ডিভাইস, ওষুধ, কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প যন্ত্রপাতি—এসব খাতে যৌথ উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে।

প্রযুক্তি হস্তান্তর হতে হবে সহযোগিতার কেন্দ্রে

উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শুধু বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের তরুণদের সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্ভাবন ও উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে Artificial Intelligence, Robotics, Biotechnology, Renewable Energy, Medical Technology এবং Smart Manufacturing-এ যৌথ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—Technology Transfer-এর বাধ্যতামূলক ও কার্যকর কাঠামো। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে শুধু মূলধন নয়, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও যুক্ত থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে হতে পারে নতুন সহযোগিতার দ্বার

বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার একটি বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো স্বাস্থ্যসেবা।

বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো, আধুনিক মেডিক্যাল প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে চীন মেডিক্যাল ডিভাইস উৎপাদন, হাসপাতাল অবকাঠামো, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।

বাংলাদেশে চীনা অংশীদারিত্বে Specialized Hospital, Medical Technology Park, Diagnostic Centre, Rehabilitation Centre এবং Medical Equipment Manufacturing Hub গড়ে তোলা যেতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের জন্য চীনে প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

এর ফলে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীর একটি অংশকে দেশে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে শুধু মানুষের অর্থ সাশ্রয় হবে না, বরং বাংলাদেশে Medical Tourism-এর বিপরীতমুখী প্রবাহ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কৃষিতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জমির স্বল্পতা, উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ দিন দিন বাড়ছে।

চীনের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ফসল, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও Food Processing-এর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে Smart Agriculture Demonstration Zone প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের হাতে সরাসরি প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নই হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য।

চীনের কারিগরি ও শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে বাংলাদেশে China-Bangladesh Technical and Vocational Training Network গড়ে তোলা যেতে পারে।

ইলেকট্রনিক্স, মেশিনারি, অটোমেশন, AI, সফটওয়্যার, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নির্মাণ, রোবোটিক্স এবং আধুনিক কৃষি—এসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের তরুণরা শুধু দেশের শিল্পে নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

শুধু অবকাঠামো নয়, শিল্পায়ন চাই

সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উৎপাদনশীল শিল্পের বিস্তার।

চীনের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নিতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ বিনিয়োগে শিল্পকারখানা স্থাপন করা যেতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত—

“Made in Bangladesh, Technology from China, Market for the World.”

এই মডেল বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

সম্পর্ক হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অর্থ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করা নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।

বাংলাদেশকে চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছুতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী দশকের জন্য প্রয়োজন একটি China-Bangladesh Strategic Economic Partnership

বাংলাদেশ এখন চাইলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি China-Bangladesh Strategic Economic Partnership Framework তৈরি করা যেতে পারে।

এর প্রধান স্তম্ভ হতে পারে—

১. শিল্পায়ন ও চীনা বিনিয়োগ
২. প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণা
৩. স্বাস্থ্য ও মেডিক্যাল প্রযুক্তি
৪. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
৫. দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ
৬. ডিজিটাল অর্থনীতি ও AI
৭. নবায়নযোগ্য জ্বালানি
৮. রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ভারসাম্য
৯. পর্যটন ও চিকিৎসা পর্যটন
১০. যৌথ উদ্যোগ ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন।

শেষ কথা

বাংলাদেশের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ শুধু বিদেশি সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। আমাদের দরকার জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সমন্বয়।

চীন তার বিশাল উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি, শিল্প সক্ষমতা ও বাজারের মাধ্যমে বাংলাদেশের এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। আর বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও উদীয়মান শিল্প সক্ষমতার মাধ্যমে চীনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।

তাই এখন সময় এসেছে সম্পর্ককে শুধু “China-Bangladesh Friendship”-এর পর্যায়ে না রেখে “China-Bangladesh Partnership for Shared Prosperity”-এর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার।

বাংলাদেশ যদি সঠিক কৌশল, দক্ষ নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে, তাহলে এই অংশীদারিত্ব শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়—শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, কৃষি, মানবসম্পদ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

# লেখক পরিচিতি:
ডা. মো. আবু কাওছার স্বপন, 
জেনারেল প্রাকটিশনার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, 
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক 
অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চায়না-অ্যালামনাই (অ্যাবকা),
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, লং লাইফ হাসপাতাল,ঢাকা।
Email : [email protected]

 

স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, ওভারসিজ চায়নিজ  অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (ও সি এ আই বি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত