এক কলেজ অধ্যক্ষকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। ঘটনার সময় বেশ কয়েকটি কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষরাও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, ভুক্তভোগী শিক্ষক মারধরের কথা বেশ কয়েকজনকে জানালেও বুধবার থেকে তিনি আর ফোন রিসিভ করছেন না। এমনকি তার বাড়িতে গিয়েও সাংবাদিকেরা তাকে পাননি।
সংসদ সদস্যের নির্যাতনে শিকার ওই শিক্ষকের নাম সেলিম রেজা। তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ।
এদিকে, অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেনকে।
বুধবার অধ্যক্ষ সেলিম রেজাকে মারধরের ঘটনা জানার পরই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান এই তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। কমিটিকে যত দ্রুত সম্ভব সরেজমিনে গিয়ে ঘটনা সবিস্তারে জেনে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনাও দেন উপাচার্য।
উপাচার্য বলেন, অধ্যক্ষ মারধরের ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুলাই রাতে নগরীর নিউমার্কেট সংলগ্ন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর মালিকানাধীন থিম ওমর প্লাজার এমপির চেম্বারে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন কলেজের আরও বেশ কয়েকজন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, গোদাগাড়ীর মাটিকাটা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আব্দুল আউয়াল রাজু ফোন করে বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের ৭ জুলাই রাত ৯টার দিকে থিম ওমর প্লাজায় এমপির চেম্বারে উপস্থিত হতে বলেন। অধ্যক্ষ রাজু এমপির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তার ফোন পেয়ে রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজাসহ আটজন অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ এমপি ফারুক চৌধুরীর চেম্বারে হাজির হন।
সেখানে এমপি প্রথমেই অধ্যক্ষ সেলিম রেজার কাছে জানতে চান তার কলেজের কতিপয় শিক্ষক একজন অধ্যক্ষ ও দলীয় নেতার স্ত্রীকে নিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা বলেছেন। প্রিন্সিপাল হিসেবে তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। জবাবে অধ্যক্ষ সেলিম বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না। যদি আপনার কাছে প্রমাণ থাকে আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
এর পরপরই এমপি তার ফোনের রেকর্ড অন করে একটি অডিও অধ্যক্ষ সেলিমকে শুনতে বলেন। এরই মধ্যে এমপি ফারুক চৌধুরী ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি সেলিম রেজাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করেন। সেখান থেকে একজন অধ্যক্ষ এমপির কবজা থেকে সেলিম রেজাকে ছাড়িয়ে নিয়ে চেম্বার থেকে বের হয়ে আসেন। পরে আহত সেলিম রেজাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কয়েকজন স্বজন ও সহকর্মীরা বাসায় পাঠিয়ে দেন।
মঙ্গলবার রাতে নগরীর রায়পাড়ার বাসায় গিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার সঙ্গে কথা বলেন একজন সাংবাদিক। প্রথমে কথা বলতে অস্বীকার করলেও পরে আগাগোড়া ঘটনার বিবরণ দেন তিনি।
তবে, বুধবার সকালে অধ্যক্ষ সেলিম রেজার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে কোনো কথা বলতে চাননি। কথা বলার জন্য তিনি বাসায় যেতে বলেন। কিন্তু তার রায়পাড়ার বাড়িতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ডাকাডাকি করলেও তিনি বা বাড়ির কেউ সাড়া দেননি, দরজাও খোলেননি। এর পর থেকে বহুবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা কলেজশিক্ষক সমিতির সভাপতি শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, ঘটনা শোনার পর তিনি সেলিম রেজার সাথে ফোনে কথা বলেছেন। তার কাছে ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সেলিম রেজা জানিয়েছেন, এমপি নিজেই তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়েছেন।
এই শিক্ষক নেতা বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। তবে, সেলিম রেজাকে এখন ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি তিনি নাকি বাড়িতেও নাই। আমি লোক পাঠিয়েছিলাম। তাকে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়ার জন্য বলছি। লিখিত অভিযোগ পেলে শিক্ষক সমিতি এটি নিয়ে মাঠে নামবে। তাছাড়া এমনিতেও শিক্ষক সমিতি বৃহস্পতিবার জরুরি মিটিং করে এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করবে।
এদিকে, এ নিয়ে বুধবার সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার মন্তব্য জানা যায়নি।
