অবশেষে তিনি রাজা হলেন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:৪৩ এএম

৮ সেপ্টেম্বর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে যুক্তরাজ্যের রাজা হন চার্লস তৃতীয়। ১৯৫২ সালে যুবরাজ হিসেবে রাজ্যাভিষেক হয় তার। ১০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা ঘোষণা করা হয় তাকে। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনসহ আরও ১৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রাজা হলেন তিনি। ৪০তম রাজা তৃতীয় চার্লসের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা হলো। লিখেছেন নাসরিন শওকত

যুক্তরাজ্যের গ্রেট ব্রিটেন, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও কমনওয়েলথভুক্ত আরও ১৪টি রাষ্ট্রের রাজা চার্লস তৃতীয়। ৮ সেপ্টেম্বর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যু হয়। এরপরই রাজকীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ৭৩ বছর বয়সী ওয়েলসের যুবরাজ চার্লস সিংহাসনে বসেন। পরে ১০ সেপ্টেম্বর লন্ডনে রাজা তৃতীয় চার্লসের আনুষ্ঠানিক অভিষেক সম্পন্ন হয়।

শৈশবের শিক্ষানবিশকাল পার করে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আধুনিকীকরণকে মূর্ত করে তুলেছিলেন চার্লস। তিনিই প্রথম সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পরের কয়েক বছর তাকে সামরিক বাহিনীর পোশাক পরে কাটাতে হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার তীব্র ঝলকানির মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রথম যুবরাজ তিনি। ১৯৮১ সালে তিনি লেডি ডায়ানা স্পেনসারকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুটি ছেলে যুবরাজ উইলিয়াম ও যুবরাজ হ্যারি রয়েছে। পরে যুবরাজ চার্লস ও যুবরানী ডায়ানা উভয়েই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৬ সালে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাদের। ২০০৫ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ডায়ানার মৃত্যু হয়। পরে চার্লস তার দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ক্যামিলা পার্কার বোলসকে বিয়ে করেছিলেন।

চার্লসের শৈশব

১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর। লন্ডনের বাকিংহাম রাজপ্রাসাদে রাত ৯টা ১৪ মিনিটে জন্ম নেন চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ উইন্ডসর। প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তার প্রয়াত স্বামী যুবরাজ ফিলিপের প্রথম সন্তান তিনি। এর এক মাস পর কান্ট্যাবেরির গির্জায় ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ খ্রিস্টীয় দীক্ষায় দীক্ষিত করেছিলেন চার্লসকে। তখন তার নাম রাখা হয় চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ। রাজা তৃতীয় চার্লসের আরও তিন ভাইবোন রয়েছেন। তার তিন বোন রাজকুমারী অ্যান, যুবরাজ অ্যান্ড্রু ও যুবরাজ এডওয়ার্ড।

চার্লসের যখন বয়স তিন বছর, তখন তার নানা রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা যান। ১৯৫২ সালের সেই সময়ে সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রানীর প্রথম সন্তান হিসেবে চার্লস একে একে নানা উপাধি পান। সিংহাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে প্রথম ডিউক অব কর্নওয়েল মনোনীত হন চার্লস। আরও কিছু উপাধিও পেয়েছিলেন চার্লস। যেমনÑ ডিউক অব কর্নওয়াল, ডিউক অব রোদসে, আর্ল অব ক্যারিক, ব্যারন অব রেনফ্রিউ, লর্ড অব দ্য আইলস এবং প্রিন্স ও গ্রেট স্টুয়ার্ড অব স্কটল্যান্ড। এরপর চার্লসের যখন বয়স ২০ বছর, তখন ১৯৬৯ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস হিসেবে রাজ্যাভিষেক হয় তার। ২০১৯ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের ৫০ বছর পূর্তি উৎসবও উদযাপন করেন। শৈশব থেকেই নানী কুইন মাদারের সঙ্গে খুব সখ্য ছিল তার। কঠোর শাসনের বাবা ফিলিপের সামনে ছিলেন লাজুক ছেলে। কখনো আবার অনাড়ি। চার্লসের যখন বয়স ৫ বছর, তখন তাকে পড়ানোর জন্য বাকিংহাম প্রাসাদে এক গৃহশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রানী এলিজাবেথ রাজপরিবারের প্রথা ভেঙে ছেলে চার্লসকে বড় করে তুলেছিলেন। তাই সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী হিসেবে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয় তাকে। ১৯৫৬ সালের প্রথমে পশ্চিম লন্ডনের হিলস হাউজ স্কুলে পড়েন। পরে বাবা যুবরাজ ফিলিপের দুটি স্কুল ইংল্যান্ডে ব্রিকশ্যায়ের চিয়াম প্রিপারেটরি স্কুল ও পূর্ব স্কটল্যান্ডের গর্ডনস্টোন বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু স্কুলের দিনগুলো বেশ অসুখী হয়েই কেটেছে কিশোর চার্লসের। ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজাকে সেই সময়ে সহপাঠীরা নানাভাবে নিপীড়ন করত। পরের এক বছর চার্লস অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ার গিলং গ্রামার স্কুলে পড়েন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও সামরিক জীবন

এ লেভেল পাস করে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে যোগ না দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাজ প্রথা ভাঙেন। ১৯৬৭ সাল। ক্যামব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হলেন চার্লস। তার পড়ার বিষয় ছিল ইতিহাস। প্রথমে প্রত্নতত্ত্ব ও পরে নৃবিজ্ঞান পড়েন। ১৯৭০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের একমাত্র যুবরাজ হিসেবে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর চার বছর পর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এমএ ক্যানট্যাব) অর্জন করেন।

১৯৬৯ সালে চার্লস সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে তিনি রাজকীয় বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ নিয়ে আরএএফ পাইলট হিসেবে উত্তীর্ণ হন। সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় তিনি ‘অ্যাকশন ম্যান’ খেতাব অর্জন করেন। পরবর্তীকালে রাজকীয় নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার চালনা শেখেন। সে সময় বিভিন্ন জাহাজেও কাজ করেন চার্লস। ১৯৭৬ সালে তিনি তার সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব শেষ করেন একজন রাজকীয় নৌবাহিনীর মাইন হান্টার এইচএমএস ব্রনিংটনের কমান্ড কমান্ডার হিসেবে।

পারিবারিক জীবন

ত্রিশ বছরের প্রিন্স অব ওয়েলসের তখন পরিচয় ছিল অনেকটা প্লেবয়ের মতো। নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগেই চার্লসের সঙ্গে ক্যামিলার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ওই সম্পর্ক চলা অবস্থায়ই ক্যামিলা এক সেনা কর্মকর্তাকে বিয়ে করেন। ১৯৭৭ সাল। লেডি ডায়ানা স্পেন্সারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় চার্লসের। ডায়ানার তখন বয়স ১৬। যুবরাজ চার্লস ১৩ বছরের বড় ছিলেন তার। সে সময় ডায়ানার বড় বোন সারার সঙ্গে ডেট করছিলেন তিনি। এর পরের দুই বছরের মধ্যে তাদের দুজনের মধ্যে তেমন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। কিন্তু ১৯৮০ সালে হঠাৎ করেই চার্লস ও ডায়ানার বাগদানের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে ডায়ানাকে চার্লস ও রাজপরিবারে সঙ্গে সময় কাটাতে বাকিংহামে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরের বছর ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুবরাজ চার্লস ও লেডি ডায়ানার বাগদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৯ জুলাই সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে যুবরাজ চার্লস ও লেডি ডায়ানার বিয়ে হয়েছিল। এই দম্পতি টেটব্যারির কেনসিংটন প্রাসাদ ও হাইগ্রোভ হাউজে তাদের নতুন জীবন শুরু করেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই জুটির সম্পর্কের ব্যবধানের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। বিয়ের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে যুবরাজ চার্লস ও রাজকুমারী ডায়ানার ঘর আলো করে জন্ম নেন যুবরাজ উইলিয়াম। এর পর ১৯৮৪ সালে দ্বিতীয় যুবরাজ হ্যারির জন্ম হয়েছিল। যুবরাজ উইলিয়াম ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের পরবর্তী উত্তরসূরি। এই দম্পতির বিয়ের ৯ বছর পার না হতেই চার্লসকে ঘিরে ত্রিভুজ প্রেমের গুঞ্জন শুরু হয়। এর পাঁচ বছরের মধ্যে চার্লস ও ডায়ানার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিষয়টি সে সময় চার্লসের ভাবমূর্তিকে ভীষণভাবে ক্ষতি করেছিল।

১৯৯৪ সাল। রাজপরিবারের অন্দরের কাহিনী প্রথম জনসম্মুখে তুলে ধরেন বিদ্রোহী রাজবধূ ডায়ানা। তিনি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তার স্বামীর সঙ্গে ক্যামিলার সম্পর্ক চলার বিষয়টি প্রথম তুলে ধরেন। এর আগে আরেক সাক্ষাৎকারে চার্লস তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ক্যামিলার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। একই বছরে ডায়ানাও রাজপরিবারের অজ্ঞাত কারও সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। ১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট। চার্লস ও ডায়ানা ‘অনিষ্পত্তিযোগ্য পার্থক্য’ থাকার কথা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট। প্যারিসে প্রেমিক ডোডি আল-ফায়েদের সঙ্গে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু হয় ডায়ানার।

ডায়ানার মৃত্যুর পর রাজপরিবার আবারও ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। চার্লস সময়ের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়েও নেন। সে সময় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। সাধারণ ব্রিটিশদের কাছের হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি সন্তানদের যত্নবান পিতা হয়ে উঠতেও দেখা যায় তাকে। ২০০৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। চার্লস ও তার ৩৫ বছরের প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার বোলসের সঙ্গে বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। বাগদানের ঘোষণার পর উইন্ডসর ক্যাসেলে একটি অনুষ্ঠানে আসেন রাজা তৃতীয় চার্লস এবং কুইন কনসর্ট। রাজকীয় পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে বেসরকারি এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে হয় এই যুগলের। এই বিয়ের মধ্য দিয়ে মিসেস পার্কার বোলস হন ডাচেস অব কর্নওয়েল। রাজা তৃতীয় চার্লস সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি হয়েছে কুইন কনসর্ট।

সরকারি দায়িত্ব

প্রিন্স অব ওয়েলসের দায়িত্বকালে চার্লস রানীর পক্ষ থেকে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই সাত দশকেরও বেশিরভাগ সময় তিনি সাধারণ জনগণের সেবা করছেন। এই সময়ে রানীর অনুপস্থিতিতে তিনি বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, নিয়মিত ওয়েলস সফর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। ১৯৭৬ সালে চার্লস তরুণ ব্রিটিশদের জন্য ‘দ্য প্রিন্স ট্রাস্ট’ দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ ছাড়াও বছরে তিনবার রাজপরিবারের কালেকশন ট্রাস্টের ছয়জন ট্রাস্টির সঙ্গে তিনি নিয়মিত সভা করতেন। যুবরাজ ওয়েলসের সভাপতি, প্যার্টন ও সদস্য হিসেবে ৪শ’রও বেশি দাতব্য সংস্থাকে সহযোগিতা করেছেন। তিনি আধুনিক স্থাপত্যের একজন সমালোচক। নগর পরিকল্পনা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ডরসেটের পাউন্ডবেরি গ্রামে বাস্তব রূপ লাভ করেছিল। একজন পরিবেশবাদী হিসেবে তিনি সে সময় বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলেন। যার মধ্যে দাতব্য সংস্থা সমর্থিত

প্রাকৃতিক চাষাবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বিকল্প ওষুধের মতো বিষয় রয়েছে। এদিকে জিনগত পরিবর্তিত ফসলের কঠোর বিরোধিতা করেন তিনি। রাজপ্রাসাদে অনেকের মনোযোগের বাইরে থেকেই বেড়ে উঠেছিলেন চার্লস। তা সত্ত্বেও নিজের মতামতের প্রতি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তার মা রানী এলিজাবেথ কখনোই নিজের মতামত সবার সামনে তুলে ধরতেন না।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

রাজা চার্লস সত্তর বছর ধরে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। যুক্তরাজ্যের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সিংহাসনে অভিষেক হওয়া সবচেয়ে বয়সী রাজা তিনি। মা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর রাজকীয় ঐতিহ্য মেনে তার উত্তরসূরি রাজসিংহাসনে বসেন চার্লস। ১০ সেপ্টেম্বর লন্ডনের সেন্ট জেমস প্রাসাদে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এদিন চার্লসকে রাজা হিসেবে ঘোষণা দেয় ব্রিটেনের ‘এক্সেশন কাউন্সিল’। সে সময় রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত এই কাউন্সিলের প্রায় ২০০ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের রাজা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন রাজা চার্লস তৃতীয়।

‘এক্সেশন কাউন্সিল’ গঠিত হয় পিভি কাউন্সিলের সদস্যদের নিয়ে। এই সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নতুন ও পুরনো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একদল জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা, কমনওয়েলথ হাইকমিশনাররা এবং লন্ডনের মেয়র। এই পরিষদ আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন পিভি কাউন্সিলের সভাপতি। সে সময় প্রয়াত রানীর জন্য প্রার্থনার পাশাপাশি নতুন রাজার সমর্থনের প্রার্থনা করা হয়। পরে নতুন রাজা চার্লস তৃতীয়ের ঘোষণাপত্রে সই করেন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ। এর পরের পর্বে রাজা চার্লস অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেন। সে সময় তিনি এক্সেশন কাউন্সিল ও পিভি কাউন্সিলের সামনে চার্চ অব স্কটল্যান্ডের উপস্থিতিতে রাজা হিসেবে একটি ঘোষণা দেন ও একটি শপথবাক্য পাঠ করেন। এবার এক্সেশন কাউন্সিল অনুষ্ঠান শেষ করে। পরে চার্লসকে রাজা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। রাজা হিসেবে শপথগ্রহণের সময় চার্লস বলেন, তিনি তার কর্তব্য ও সার্বভৌমত্বের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে খুবই সচেতন। জনগণের ভালোবাসা ও আনুগত্যের মধ্য দিয়েই তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। তবে রানীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার পর তাকে রাজকীয় অভিষেকের মধ্য দিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লস হিসেবে বরণ করে নেওয়া হবে।

রাজা তৃতীয় চার্লসের দায়িত্ব

চার্লস তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বছরগুলোতে বরাবর রানীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০১৮ সাল। তাকে রানীর মনোনীত উত্তরসূরি হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২১ সালে তার বাবা যুবরাজ ফিলিপ মারা যান। এরপর থেকে এই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া জোরালো হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের ১০ মে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রাষ্ট্রীয় উদ্বোধনের দিন ছিল। ওই দিন রানী ওয়েলেসের যুবরাজ চালর্সকে প্রথমবারের মতো ওই উদ্বোধনের সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। রানীর প্রতিনিধি হিসেবে সে সময় চার্লস সাংবিধানিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালন করেন, যা তার রাজা হওয়ার প্রক্রিয়ার পথকে সুগম করার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের রাজা হলেন রাষ্ট্রপ্রধান। তবে তার ক্ষমতা কিছুটা প্রতীকী ও আনুষ্ঠানিক। রাজা তৃতীয় চার্লসকে এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই সরকারি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। এ দায়িত্বের মধ্যে সরকার নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি সংসদে নির্বাচিত জয়ী দলের নেতাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। আবার সংসদ নির্বাচনের আগেই রাজাই আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার ভেঙে দেবেন।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সংসদীয় বছরের প্রথম বার্ষিক অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা রাজা চার্লসকেই করতে হবে। হাউজ অব লর্ডসে ভাষণে রাজা সরকারের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন। এ ছাড়াও পার্লামেন্টে কোনো বিল পাস হলে সেটাকে আইনে পরিণত করতে তিনিই অনুমোদন দেবেন।

রাজা তৃতীয় চার্লসকে প্রতিদিন একটি বিশেষ দায়িত্বও পালন করতে হবে। প্রতিদিন একটি লাল চামড়ার বাক্সে করে তিনি সরকারি বার্তা পাবেন। যেখানে আসন্ন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পর্কে ব্রিফিং বা কোনো দলিল থাকবে। সেখানে রাজাকে স্বাক্ষর দিতে হবে। সাধারণত বুধবার প্রধানমন্ত্রী সরকারি বিষয়ে রাজাকে অবহিত করতে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। যা পুরোপুরিই গোপনীয়। তবে এখন থেকে রাজা চার্লসকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। প্রকাশ্যে কোনো বিষয়ে জোরালো মতামত দিতে পারবেন না তিনি।

ধারণা করা হচ্ছে, রাজা তৃতীয় চার্লস রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে রাজকার্য পরিচালনায় পরিবর্তন আনবেন। সেজন্য রাজপরিবারের আকারকে ছোট করে নিয়ে আসতে পারেন তিনি। সম্ভবত রাজপরিবারের কেন্দ্রে থাকা সদস্যদের নিয়ে একটি ছোট দল গড়ার ওপর বেশি জোর দিতে পারেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন চার্লস এবং ক্যামিলা, প্রিন্স উইলিয়াম ও ক্যাথরিনের মতো সদস্যরা।

রাজা চার্লসের উত্তরাধিকার হিসেবে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরসূরি হলেন তার বড় সন্তান যুবরাজ উইলিয়াম। এর পর উইলিয়ামের বড় সন্তান যুবরাজ জর্জ ও তার কন্যা রাজকন্যা শার্লট তৃতীয়। তবে চার্লস এমন সময় রাজসিংহাসনে বসেছেন যখন রাজপরিবার নিয়ে জনগণের মনোভাব বদলে যেতে শুরু করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত