আবাহনী আবার কবে সর্বজয়ী হবে?

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২১, ০২:১৪ এএম

ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে বসুন্ধরা কিংসের কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পর আবদুল ওয়াজিদ নামে আবাহনীর এক সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আবাহনীকে দেখে এখন খুব খারাপ লাগে। বয়সের কারণে অচল একগুচ্ছ খেলোয়াড় নিয়ে দলটি বছরের পর বছর খেলে যাচ্ছে। অথচ ৯৩-৯৪’র দিকে মোনেম মুন্না একঝাঁক তরুণ খেলোয়াড় নিয়েই দলকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। নতুন খেলোয়াড় তৈরির এই প্রয়াস কোথায় হারিয়ে গেল? আবাহনীর কর্তাদের এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

শরিফুল ইসলাম নামে আরেক সমর্থক আবাহনীর সাইড বেঞ্চের বাস্তব চিত্রটা তুলে ধরেছেন ব্যঙ্গাত্মক উক্তির মধ্য দিয়ে, ‘আবাহনীর ডাগআউটে দেখি আমাদের এলাকার কিন্ডারগার্টেনের বেঞ্চ।’

ধানম-ির ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির দুই সমর্থকের কথাতেই পরিষ্কার অনেক কিছু। পেশাদার যুগে সবচেয়ে সফল দল হয়েও গত দু’বছর আবাহনীকে ঠিক সর্বজয়ী রূপে দেখা যাচ্ছে না। অনেকে তো ব্যঙ্গ করে ‘ওল্ড হোম’ (বৃদ্ধাশ্রম) নামে ডাকা শুরু করেছে আবাহনীকে। বসুন্ধরা কিংসের আবির্ভাবেই যেন তালটা কেটে গেছে আকাশিদের। কিংস মাত্র তিন বছরেই দেখিয়েছে পেশাদারি মনোভাবে কী করে সাফল্যের চূড়া ছোঁয়া যায়। আবাহনীর শ্রেষ্ঠত্ব এখন কিংসের দখলে। কিংসের কাছে তারা হারিয়েছে লিগ শিরোপা। টুর্নামেন্টগুলোতেও আবাহনীকে ছিটকে সেরা কিংস। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে দল দুটির প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই লড়াইটা আবাহনী জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। সেটিই ছিল আবাহনীর সর্বশেষ শিরোপা। এরপর কেটে গেছে দু’বছরেরও বেশি সময়। এর মধ্যে দু’দলের আরও চারবার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই জয়ী বসুন্ধরা কিংস। আবাহনী যখন মসনদ হারিয়ে দিশেহারা, তখন সর্বজয়ী রূপে আবির্ভূত কিংস যা সহজে মেনে নেওয়া অনেকের জন্যই কষ্টকর। অনেকে তো প্রশ্নই তুলে দিচ্ছেন, ‘আবাহনী কি তবে মোহামেডান হবে?’ মোহামেডানের সঙ্গে আবাহনীর তুলনার সময় হয়তো এখনো আসেনি। এবারও আকাশিরা কাগজে-কলমে দ্বিতীয় সেরা দল। তবে সেরার (কিংস) সঙ্গে মানে-গুণে দ্বিতীয় সেরার ব্যবধানটা বিস্তর। কিংস শিবিরে আছে জাতীয় দলের ১৪ ফুটবলার। ভিনদেশি সংগ্রহেও তারা চ্যাম্পিয়ন। কিংসের বেঞ্চে যারা আছেন, তাদের অনেকেই নির্বিঘেœ জায়গা পাবেন আবাহনীর মূল একাদশে। আর আবাহনী এখনো আস্থা রাখছে মামুনুল ইসলাম, নাসিরউদ্দিন চৌধুরী, ওয়ালী ফয়সাল, রায়হান হাসানের মতো একঝাঁক বয়স্ক ফুটবলারে।

বৃহস্পতিবার সেমিফাইনালেই দু’দলের বেঞ্চের বৈপরীত্যের প্রমাণ মিলেছে। পিছিয়ে থাকার পর যে দু’গোলে কিংস লিড নিয়েছিল, সেই দুটি গোলের পেছনের কারিগর ছিলেন বেঞ্চ থেকে আসা আলমগীর কবির রানা ও মতিন মিয়া। আর সেই ম্যাচেই আবাহনী বদলি হিসেবে নামিয়েছে মামুনুল ইসলাম, ওয়ালী ফয়সালদের। দুজনেরই বয়স পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর পর ‘ক্লান্ত’ মামুনুলকে তো তুলেই নিতে বাধ্য হলেন আবাহনীর পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমস।

আসলে আবাহনী যে পথে হেঁটে ছ’বার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, প্রায় এক যুগ রাজত্ব করেছে; সেই পথ এখন আর আগের মতো মসৃণ নয়। সেই চেনা পথে হেঁটে আর যাই হোক পেশাদারি মনোভাবে গড়া বসুন্ধরা কিংসকে টেক্কা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনটাই মনে করেন আবাহনীর হয়ে এক সময় মাঠ কাঁপানো শেখ মোহাম্মদ আসলাম। কেবল দলের নয়, আসলাম মনে করেন শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেতে পাল্টাতে হবে পুরো ক্লাবের খোলনলচে ‘সময়ের সঙ্গে যদি আপনি নিজেকে না পাল্টান তবে এক সময় আপনাকে পেছনে পড়তেই হবে। বসুন্ধরা কিংস, সাইফ স্পোর্টিংয়ের মতো করপোরেট দলগুলো পরিচালিত হচ্ছে পেশাদারি ঢঙে। তারা সঠিক পরিকল্পনায় হেঁটেই এখন সাফল্য পেতে শুরু করেছে। টিকে থাকতে হলে আবাহনীকেও নিজেদের ভাবনায় পরিবর্তন আনতে হবে। ক্লাবের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের মধ্যে সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রবণতা নেই। আমরা যারা আবাহনীকে অসংখ্য শিরোপা এনে দিয়েছি, লাখো মানুষের প্রিয় দলে পরিণত করেছি, আমরাই ক্লাবে কখনো মূল্যায়িত হইনি। তাই মাঠের পাশাপাশি পরিবর্তন প্রয়োজন আবাহনীর নেতৃত্বেও।’

আরেক সাবেক ফুটবলার আবদুল গাফফার কিংস-সাইফের দেখানো পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন ‘কিংস, সাইফ গত দু’বছর ধরে ইয়ুথ অ্যাকাডেমি করে খেলোয়াড় তৈরি করছে। তারা সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে বলেই সাফল্য পাচ্ছে। আবাহনীকেও এভাবেই চিন্তা করতে হবে। আমি মনে করি, আবাহনী-মোহামেডানের ভালো দল গড়ার ক্ষেত্রে অর্থ বড় সমস্যা নয়। আন্তরিকতা থাকলে, সঠিক পরিকল্পনা নিলে, এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে এখনই এর উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে আবাহনীর পরিণতি মোহামেডানের মতো হয়ে যাবে।’ ফুটবলের সিংহাসন ফিরে পেতে পরিবর্তনের বিকল্প নেই আবাহনীর। নইলে মোহামেডানের মতো এক সময় আবাহনীর পরিণতিও হবে বেদনাদায়ক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত