২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল। দিনটি হয়তো ভুলে যেতে চাইবেন তাসকিন আহমেদ। কিন্তু দুঃখের স্মৃতি কি সহজে পিছু ছাড়ে? বারবার উঁকি দেয় মনের আঙিনায়। কী হয়েছিল সেদিন, এটা প্রায় সবার জানা। বিসিবি একাডেমিতে সাংবাদিকদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তাসকিন। যে ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে, হৃদয় কেড়েছিল অনেকেরই। বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পাওয়ার কষ্টে সেদিন চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি এই পেসার। চার বছর পরের বিশ্বকাপে সেই তাসকিনই এখন বাংলাদেশের পেস বোলিং বিভাগের নেতা। তার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে কোটি কোটি সমর্থক। দুর্দান্ত কিছু করে দলের জয়ে অবদান রাখবেন তিনি, চাওয়া সবার।
গত বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়ার পর নিজের মধ্যে আমূল পরিবর্তন এনেছেন তাসকিন। কঠোর পরিশ্রম করেছেন। নিজেকে ভেঙে গড়েছেন নতুন করে। করোনার সময় যখন স্থবির ছিল পুরো দুনিয়া, একক প্রচেষ্টায় ফিটনেস অনুশীলন করে গেছেন তিনি। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করেছেন গভীরভাবে। ব্যক্তিগত ও খেলোয়াড়ি জীবন, দুই জায়গাতেই এনেছেন কঠিন শৃঙ্খলা। যার সুফলও পাচ্ছেন তিনি। তাসকিন এখন উপলব্ধি করতে পারছেন, বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পাওয়া তার জন্য ছিল আশীর্বাদ। কয়েক মাস আগে যেমন বলেছেন, ‘২০১৯ বিশ্বকাপে যখন বাদ পড়েছিলাম, ওই মুহূর্তটা খুব দুঃখজনক ছিল আমার জন্য। তবে এখন বুঝতে পারি, আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তারপর নিজের ওয়ার্ক এথিকস, প্রসেসে বদল আনি আমি।’ আর এটাই এখন তাকে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে ভালো করতে।
কঠিন সময় পেছনে ফেলতে নিজের চেষ্টা তো ছিলই তাসকিনের। একই সঙ্গে এই পথচলায় তিনি গুরু হিসেবে পেয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার ওটিস গিবসনকে। এখন বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং কোচ দক্ষিণ আফ্রিকান গ্রেট অ্যালান ডোনাল্ড। যাদের সান্নিধ্যে এখন আরও পরিণত ২৮ বছর বয়সী তাসকিন। হয়ে উঠেছেন দলের বোলিং বিভাগের সেরা অস্ত্র। ক্যারিয়ার জুড়েই তাসকিনকে ভোগাচ্ছে চোট। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা এই পেসার মাঝে লম্বা একটা সময় ছিলেন জাতীয় দলের বাইরে। ২০১৭ সালের পর ওয়ানডে দলে ফেরেন তিনি ২০২১ সালে। বলা যায়, এরপর থেকে পুনর্জীবিত হতে শুরু করে তার ক্যারিয়ার। সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন তিনি গত এক বছর ধরে। এই সময়ে ১৪ ওয়ানডে খেলে তার শিকার ২৫ উইকেট। বোলিং গড় কমে এসেছে ২০.৫২-এ। ২০২২ সালও খারাপ যায়নি তাসকিনের, ১০ ওয়ানডেতে ধরেছেন ১৪ শিকার। বাংলাদেশের একমাত্র বোলার হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গত বছর গড়েছেন তিনি। প্রথমবার দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের ওয়ানডে সিরিজ জেতার পথে তার শিকার ছিল ৮ উইকেট। তাসকিনের ভাষায়, প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় আসছে সাফল্য।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাসকিনের পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো নয়। এখন পর্যন্ত ৮ ওয়ানডে খেলে তার শিকার কেবল ৮ উইকেট। রান দিয়েছেন ওভারপ্রতি ছয়ের কাছাকাছি। আর ভারতের মাটিতেও ওয়ানডে খেলার তেমন অভিজ্ঞতা নেই এই পেসারের, ২ ম্যাচে শিকার দুটি। বিশ্বকাপেও শুরুটা ভালো হয়নি তাসকিনের। প্রথম দুই ম্যাচে দুই উইকেট নিলেও নতুন বলে দলকে সাফল্য এনে দিতে পারেননি তিনি। এমনকি প্রস্তুতি ম্যাচ দুটিতেও জ্বলে উঠতে পারেননি, নেন কেবল এক উইকেট। তার শুরুতে উইকেট না পাওয়া বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছে, মনে করছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মিসবাহ উল হক। ব্যর্থতার কথা অবশ্য অকপটেই স্বীকার করে নিয়ে তাসকিন শুনিয়েছেন সামনে ভালো করার আশাবাদ। চেন্নাইয়ের উইকেট সাধারণত স্পিনারদের সহায়তা করে। সেখানে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন কিনা তাসকিন, সেটা সময়ের হাতে তোলা থাক।
বিশ্বকাপে তাসকিন এখনো নিজেকে মেলে ধরতে না পারলেও ডেভন কনওয়ে ঠিকই দেখাচ্ছেন নিজের সামর্থ্য। আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসে যেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন কনওয়ে। ২৮৩ রানের লক্ষ্য তাড়ায় এই ওপেনার একাই করেছেন ১২১ বলে অপরাজিত ১৫২ রান। প্রস্তুতি ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ৭৮ রান আসে তার ব্যাট থেকে। ভারতে আসার আগে ইংল্যান্ডে খেলেছেন ১১১ রানের ইনিংস। বাংলাদেশের জন্য যে বড় হুমকি কনওয়ে, তা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
কনওয়েকে যত দ্রুত সম্ভব ফেরানোর দায়িত্ব থাকবে তাসকিনের কাঁধে। নতুন বলে তার কাছে যে উইকেট চায় দল। সেটা কিউই বাঁহাতি ওপেনার হলে তো সোনায় সোহাগা। যদিও তার বিপক্ষে এখন পর্যন্ত একবারও সফল হননি তাসকিন। দুই টেস্ট, তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে দুজনের মুখোমুখি দেখায় প্রতিবারই বাংলাদেশ পেসারকে হতাশ করেছেন ৩২ বছর বয়সী ক্রিকেটার।
সবশেষ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৩২ রানে আউট হয়ে যান কনওয়ে। এবার প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ ভেবে কিছুটা স্বস্তিতে থাকার কথা তার। হয়তো মুখিয়ে আছেন এই ম্যাচ দিয়ে আরেকটি বড় ইনিংস খেলার জন্য। দলটির বিপক্ষে যে তার পারফরম্যান্স দুর্দান্ত। এখন পর্যন্ত ৩ ওয়ানডে খেলে একটি করে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করেছেন তিনি। ব্যাটিং গড় ৭৫। আর ভারতের মাটিতে ৫ ওয়ানডে খেলে দুটিতেই সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া কনওয়ে। চলতি বছর চমৎকার কাটছে তার। পাঁচ ওয়ানডে সেঞ্চুরির চারটিই ২০২৩ সালে করেছেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার ও ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপের বেশ পছন্দের একজন ব্যাটসম্যান হয়ে উঠেছেন কনওয়ে। ভারতের কন্ডিশন সম্পর্কেও ভালো ধারণা আছে তার। আইপিএলের গত দুই মৌসুমে খেলেছেন তিনি। চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে ২০২২ আসরে ৭ ম্যাচে ৩ ফিফটিতে তার রান ছিল ২৫২। গতবার নিজের সেরাটা মেলে ধরেন তিনি। চেন্নাইয়ের পঞ্চম শিরোপা ঘরে তোলার পথে ১৬ ম্যাচে ৬ ফিফটিতে ৬৭৩ রান আসে তার ব্যাট থেকে। আসরে যা ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ। গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘি্নত ফাইনালে ২৫ বলে ৪৭ রান করে ম্যাচ সেরাও হয়েছিলেন তিনি। ফর্মে থাকা এমন একজন ব্যাটসম্যানকে কীভাবে সামাল দেয় বাংলাদেশ, তার জবাব মিলবে আজ।
তাসকিন আহমেদ
পেসার
৯ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে কেবল ৬৫ ম্যাচ খেলেছেন তাসকিন আহমেদ। ২৯.৩৬ গড়ে নিয়েছেন ৯২ উইকেট। ২০১৫ বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সেরা বোলার ছিলেন তিনি।
ডেভন কনওয়ে
ব্যাটসম্যান
দুই বছর ধরে ওয়ানডে খেলা ২৪ ম্যাচে ৫ সেঞ্চুরিতে করেছেন ১০৫৮। গড় ৫২.৯০, স্ট্রাইক রেট ৮৯.৪৩। নিজের প্রথম বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখতে চাইবেন তিনি দারুণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে।
