দেশের ৬৬ ভাগ নারী ঘরেই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রচলিত ধারণা এবং সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশ্বাস হচ্ছে, ‘নারীরা ঘরেই বেশি নিরাপদ’। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে নারীদের প্রতি বেশিরভাগ সহিংসতা বাড়িতে সংঘটিত হয়। ঘরের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন নারীই নানাভাবে পরিবারের লোকজনের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে।
বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের হল রুমে এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
অ্যাকশন এইডের পরামর্শক হিসেবে গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমিন। গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপনও করেন তিনি। গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা-সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটি মামলাই আদালতে আসতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তারপর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের পক্ষে বিচার পায়, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। আদালত মামলা খারিজ করে দেওয়ার বা আসামিকে খালাস দেওয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ। শুধু ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা থাকে পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত। যদিও বেশিরভাগ অভিযোগ পারিবারিক সহিংসতা-সম্পর্কিত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৭৫ শতাংশ প্রতিবেদনে ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ-সম্পর্কিত।
গবেষণায় সহিংসতা প্রতিবেদন কম হওয়ার কারণগুলোর তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ দাখিলসংক্রান্ত কোনো তথ্য থাকে না, এলাকার ক্ষমতাসীনদের বাধা এবং হস্তক্ষেপ, সুশাসনের অভাব, ঘরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকা, মামলার ধীরগতির কারণে ভুক্তভোগীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ নিয়ে যেতে চায় না, বেশিরভাগ সময়ই ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে রায় যায়, যা তাদের আরও সমস্যায় সমস্যায় ফেলে দেয়।
এ ছাড়া, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ‘কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ২০০৯ বাস্তবায়ন’ বিষয়ক আলাদা একটি গবেষণাপত্রও উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায় বা নির্দেশনা ঘোষণা করে। তবে এ নির্দেশনা প্রণয়নের দীর্ঘ নয় বছর পরেও কর্ম এবং এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা কৌশল হাতে নিতে দেখা যায়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত কমিটির কথা জানেন না। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানেন না।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার ক্ষেত্রে কর্র্তৃপক্ষ, বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অসচেতনতার উল্লেখযোগ্য অভাবের কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নিজ ঘরে এর ব্যাপকতা নির্মূল করার জন্য একটি আইন করা এবং তার বাস্তবায়ন করা, নারীরা যেন ঘরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো চিহ্নিত করতে পারে সেজন্য তাদের সচেতন করতে হবে ও ক্ষমতা বাড়াতে হবে, নারীরা যাতে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিংবা অভিযোগ করতে পারে সেজন্য সব তথ্য দেবে এবং সহযোগিতা নিশ্চিত করবে সরকার সুপারিশ প্রকাশ করা হয়। সুপারিশে গণমাধ্যমকে পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে নজর দিতে বলা হয়।
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর ডেপুটি ডিরেক্টর ফারিয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল করিম, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর সামিয়া হক, বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনসহ অনেকে।
