বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আত্মসমর্পণের আগেই সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫৫ এএম

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি টেকনাফের নুর মোহাম্মদ চলতি মাসের শুরুতে ইয়াবাসহ আটকের পর এখন পুলিশ হেফাজতে আছেন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাড়া খেয়ে তার পরিবারের সদস্যরা আছেন আত্মগোপনে। কিন্তু টেকনাফের নাজিরপাড়ায় প্রায় ৪০ শতক জমির ওপর তৈরি তার দোতলা আলিশান বাড়ি বিক্রির চেষ্টা থেমে নেই।

গত দুই দিন সরেজমিনে ঘুরে নুর মোহাম্মদের মতোই তালিকাভুক্ত একাধিক মাদক কারবারির সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন। তবে মাদক কারবারিরা যাতে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে বলে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারিদের সম্পত্তি তদন্তের পর বাজেয়াপ্ত করতে পুলিশসহ একাধিক সংস্থাও তৎপর রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার পাঁয়তারার তথ্য আমরা পেয়েছি। আমরা বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রেখেছি। আমরা চাইছি মাদক কারবারিদের সম্পত্তিগুলো তদন্তের পর বাজেয়াপ্ত করতে। দুদক ও এনবিআরসহ কয়েকটি সংস্থাও তদন্ত করতে চাইছে। ইতিমধ্যে সিআইডি টেকনাফের ইয়াবা কারবারি নুরুল ইসলাম ভূট্টোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আদালতে আবেদন করেছে। আশা করি, পুলিশকে দিয়েই সম্পদের বিষয়টি তদন্ত করাবে।’

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৪-এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো মাদকদ্রব্য অপরাধের জন্য দায়েরকৃত কোনো মামলা চলাকালীন অভিযোগকারী যদি এই মর্মে আবেদন করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির মাদকদ্রব্য অপরাধ প্রমাণিত হইলে তাহার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিবার প্রয়োজন হইবে এবং সেই কারণে তাহার সম্পত্তির বিক্রয়, বন্ধক, হস্তান্তর অথবা অন্য কোনো প্রকার লেনদেন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করিবার আদেশ প্রদান প্রয়োজন, তাহা হইলে ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দান করিয়া, প্রয়োজনবোধে, অনুরূপ আদেশ প্রদান করিবে।’

পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফে ১ হাজার ১৫১ জন মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে ৭৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারি বা পৃষ্ঠপোষকের নাম আছে। তালিকার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ তার পরিবারের ২৬ জন সদস্যের নাম রয়েছে। তা ছাড়া টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের নেতাদেরও নাম আছে। তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের বিপুল সম্পত্তির বিষয়টিও তাদের নজরে আছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে টেকনাফের মাদক কারবারিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউ কেউ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন; আবার কেউ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, শীলবনিয়াপাড়া, মিঠাপানিরছড়া, লম্বরিপাড়া, জালিয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপসহ কয়েকটি স্থানে ইয়াবা কারবারিদের বাড়িঘরের দরজায় তালা দেওয়া দেখা যায়। আবার কিছু বাড়িতে বাসা ভাড়ার সাইনবোর্ড ঝুলছিল। তাদের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে তাদের বসতভিটাসহ অন্য জমিজমা বিক্রির চেষ্টা চলছে।

পুলিশ হেফাজতে থাকা ইয়াবার কারবারি নুর মোহাম্মদের দূর-সম্পর্কের আত্মীয় মোহাম্মদ ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাস ছয়েক ধরে অত্যাধুনিক দোতলা বাড়িসহ ৪০ শতক জমি বিক্রির চেষ্টা করে চলছে। গত মাসে এক ব্যবসায়ী ১ কোটি টাকা দাম বলেছিল, কিন্তু এটার দাম ৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। কিছুদিন আগে নুর মোহাম্মদ ২০ লাখ টাকায় ফসলি জমি বিক্রি করেছেন।’

নুর মোহাম্মদের জামাতা মাহমুদ আলীও তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। শ্বশুরের সঙ্গে তিনিও পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। ফারুক বলেন, মাহমুদের ৪০ শতকের বসতভিটাও বিক্রির চেষ্টা চলছে, কিন্তু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

মাসখানেক আগে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান আরেক তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি জিয়াউর রহমান। তার প্রতিবেশী শামশুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিয়াউর মৃত্যুর আগে নাজিরপাড়া কবরস্থান সংলগ্ন নিজের দোতলা বাড়িটি জমিসহ বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকার ওপরে। এক ব্যক্তি এসে বাড়িটির দাম ৫০ লাখ টাকা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি বিক্রি করেননি।

জিয়াউরের মা নুর বেগম বলেন, ‘জিয়াউরকে বারবার বলেছিলাম এত সম্পদ করার দরকার নেই, শত্রু বেড়ে যাবে। সেই কথাটিই সত্য হলো। তাকে পুলিশ মেরে ফেলল। এখন এই সম্পদ দিয়ে আমার কী হবে? এখন বাড়িসহ সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিব। কোনো কিছুই আর রাখতে চাই না।’

আরেক তালিকাভুক্ত ইয়াবার কারবারি নাজিরপাড়ার এনামুল হক, যিনি এলাকায় এনাম মেম্বার হিসেবে পরিচিত। তিনি এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তার এক স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০ শতক জমির ওপর এনামের বাড়িসহ সম্পত্তির দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু ৪০ লাখ টাকার বেশি কেউ দাম করেনি।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোপনে জমি বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি বিক্রি করতে চায়, তাহলে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। কোনো মাদক কারবারি যদি অনুমতি ছাড়া সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত