মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইকোনমিক ক্যাডারের বিলুপ্তি : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:০৮ পিএম

সম্প্রতি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার একীভূত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ক্যাডার সংখ্যা ২৭ থেকে ২৬-এ অবনমিত হলো। সংবাদপত্রে যেভাবে তথ্য এসেছে, তাতে জানা গেল, এ দুটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আগ্রহেই সিভিল সার্ভিসে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে ১৯৮০ সালে অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে সৃষ্ট ইকোনমিক ক্যাডার এখন বিলুপ্ত। Services (Reorganization and Conditions) Act, 1975,এর ধারা ৪-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার এ পুনর্গঠন কাজ সুসম্পন্ন করেছে। সংবিধান ও আইনের আওতায় এ জাতীয় কাজ সরকারের রুটিন দায়িত্বের আওতাভুক্ত। সেদিক থেকে বিচার করলে এ জাতীয় পুনর্গঠন কাজ একেবারেই সাদামাটা ও পুরোপুরি নির্দোষ হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা ও উপযোগিতা যাচাই করা হয়েছে কি না তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।

ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠান হরহামেশা একীভূত হতে দেখা যায়; তবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। উদ্দেশ্য থাকে ব্যয় সংকোচন, দক্ষতা বৃদ্ধি, দ্বৈততা পরিহার, সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য মুনাফা নয়; জনকল্যাণ। জনস্বার্থ সুরক্ষা ও জনসেবার মানোন্নয়নের জন্য সরকার চাকরির শর্তাবলি পরিবর্তন, সংশোধন, পরিবর্ধন ও পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনবোধে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন শর্তাবলি-সংবলিত নতুন চাকরি সৃজন করে থাকে; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেখানে মুখ্য বিবেচ্য বিষয় হয় না। কিন্তু আলোচ্য সংবাদটি যেভাবে পরিবেশিত হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে, দুটি ক্যাডার একীভূতকরণের মাধ্যমে উভয়ের জন্য জয়জয়কার অবস্থা (win-win situation) সূচিত হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের কী উপকার হবে, জনসেবার মানেরই বা কী ইতিবাচক পরিবর্তন হবে, তার কোনো উল্লেখ তাতে ছিল না। তবে এ দুটি ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে একটি মিল আগে থেকেই ছিল। ২৭ ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে শুধু এই দুটি সার্ভিসের যুগ্ম সচিব বা তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তারা সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার টাকা ও তা পরিচালনার জন্য মাসিক ভিত্তিতে ভাতা পেতেন। বর্তমানে এ সুবিধা উপসচিব পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। সার্ভিস একত্রীকরণের মাধ্যমে এ সুবিধা এখন কেবল সচিব বা শেষাংশে সচিব শব্দযুক্ত পদধারীদের মধ্যে সীমিত হয়ে গেল। ফলে অন্তত এ ক্ষেত্রে আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের অভিযোগ তিরোহিত হলো।

ইকোনমিক ক্যাডারের অধিক্ষেত্র ছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন। তা ছাড়া প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পরিকল্পনা কমিশনের একটি করে ইউনিট বা সেল রয়েছে। এসব ইউনিটে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিভিন্ন পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প সম্পর্কিত কাজের দেখভাল করতেন। সত্যি কথা বলতে কি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের কাজ বিশেষায়িত ধরনের। বার্ষিক, দ্বিবার্ষিক, পঞ্চবার্ষিক ও পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেগুলোর পরিধারণ এ মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ। এর সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে শতবর্ষব্যাপী ডেলটা পরিকল্পনা-২১০০। পানিসম্পদের প্রভূত উন্নয়ন, দুর্যোগ প্রশমন ও সংক্ষেপণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গতিশীল উন্নয়ন কৌশল ও সক্ষমতা অর্জন প্রভৃতিসহ সমাজের অনেক জটিল ও বিস্তৃত বিষয় এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রতিটি পরিকল্পনায় দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা থাকে। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানের সূত্র ও অনুসিদ্ধান্তগুলো স্বতঃসিদ্ধ না হওয়ায় ওই সব লক্ষ্যমাত্রা সব সময় শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয় না। আবার এখানে হিতে বিপরীত ফল লাভও বিচিত্র না। এর প্রধান কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গতি ও প্রকৃতির প্রাক্কলন সম্পর্কে অগ্রভাগে পর্যাপ্ত জ্ঞানলাভের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পূর্বপরিকল্পিত ব্যবস্থাপত্রের উপযোগিতা ও কার্যকারিতার অনিশ্চয়তা। আর্থসামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এ সমস্যা সব সময় পরিকল্পনাবিদদের তাড়িয়ে বেড়ায়। হিতে বিপরীত ফল লাভ হলে অর্থনীতির ভাষায় তাকে মিত্রপক্ষের গুলি (riendly fire) হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত এন্তার। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করে যে বিদ্যুৎ আমরা পাচ্ছি, তার সঙ্গে এ প্রকল্প যে আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি করেছে, তার আর্থিক মূল্য তুলনা করলে আমরা পরিকল্পনায় মিত্রপক্ষের গুলির নমুনা পাই। কাজেই পরিকল্পনাবিদের এবং সেই সঙ্গে যারা তাদের এ কাজে সহায়তা দেবেন, সেই আমলাদের গবেষণা ও উন্নয়নকাজে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, গভীর জ্ঞান ও গতিশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, সেখান থেকে তাকে দ্রুততম সময়ে বাঞ্ছিত পর্যায়ে নিতে হলে পরিকল্পনার কুশীলবদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাদারির প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

ভারত ২০১৪ সালে তার ৬৫ বছরের পুরনো পরিকল্পনা কমিশনকে বিলুপ্ত করে NITI (National Institution for Transforming India) প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক কাঠামো প্রবর্তন, স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী গণভিত্তিক বটম-আপ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, জ্ঞান, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাবান্ধব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ সম্প্রদায় গড়ে তোলার মাধ্যমে উন্নয়নকে বেগবান ও টেকসই করা এর অন্যতম কাজ। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ স্বাধীনতার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিকল্পিত উন্নয়নের অগ্রগতি দেখে চমৎকৃত হয়ে নিজ নিজ দেশে শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে। পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৫৫ সালে প্রকাশ করা হয়। ভারত তা করে ১৯৫১ সালে। দুটি দেশই পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করতে সমর্থ হয়। যদিও পাকিস্তানের পূর্বাংশে সে উন্নতির হার ছিল খুবই মন্থর; অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক। এ জন্য সেই সময়ের বাঙালি অর্থনীতিবিদরা ‘এক পাকিস্তান, দুই অর্থনীতি’র তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে তৎকালীন বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্বাধিকার আন্দোলন সংহত করতে সহায়তা করেন এবং পরিণতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের গোড়াপত্তনে ভূমিকা রাখেন। যা হোক, মূল কথা হলো দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরে ইকোনমিক ক্যাডারের পেশাদারির প্রয়োজনীয়তা যেখানে বাড়ছে, সেখানে একটি বিশেষায়িত প্রকৃতির ক্যাডার বিলুপ্ত করার মাধ্যমে পেশাদারির ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়ে পড়ল কি না, তা ভেবে দেখার অবকাশ ছিল।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন নতুন কাজের সৃষ্টি যেমন হয়, তেমনি অনেক কাজ তার প্রয়োজনীয়তা হারায়। একসময় ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠিপত্র চালাচালির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এখন তার প্রধান কাজ হয়ে পড়েছে সঞ্চয়পত্র ক্রয়-বিক্রয়; চিঠিপত্র আর মানি-অর্ডার এখন অনেক দূরে। একসময় টেলিফোন সংযোগ পেতে কত কাঠখড় পোড়াতে দেখেছি। আর এখন ল্যান্ডফোনকে অনেকেই বোঝা মনে করে; কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। তাই যুগের চাহিদা অনুযায়ী সিভিল সার্ভিসেরও পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন; সর্বোপরি কাঠামোগত সংস্কার দরকার। বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরের এ পর্যায়ে এ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৪০ বছর আগে সৃষ্ট যে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে; গঠন, কার্যক্রম, সেবার মান, পরিমাণ ও ধরনের দিক থেকে তাদের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে আদৌ সংগতিপূর্ণ নয়; থাকতেও পারে না। কিন্তু সমস্যা হলো সরকারি প্রশাসন যন্ত্রে একবার কোনো কাজ শুরু হয়ে গেলে তার পরিবর্তন সহজে হয় না, চলতেই থাকে; প্রয়োজনীয়তা থাকুক আর নাই থাকুক। বরং অনেক ক্ষেত্রে তার অপ্রয়োজনীয় কলেবর আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে  Cyril Northcote Parkinson তার বিখ্যাত গ্রন্থ Parkinson’s Law-তে চমকপ্রদ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলেবর যখন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছিল, তখন কীভাবে তার কলোনি অফিসের লোকবল ও কাঠামোর স্থূলতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের প্রয়োজনে যেসব নতুন নতুন অফিস গড়ে ওঠে, যুদ্ধ অবসানের পর সেগুলো প্রয়োজনীয়তা হারায়। কিন্তু যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনকাজে সেগুলোর ব্যবহার পুরোদমে শুরু হয়। এটা দেখে তিনি এ অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হন, ‘An Office Never Dies’। এখনো সবখানে এ সূত্র অনুযায়ী কাজকর্ম চলতে দেখা যায়, দরকার থাক বা না থাক।

পাকিস্তান আমলে সরবরাহ বিভাগ নামে একটি বিশেষায়িত বিভাগ খোলা হয়, যার কাজ ছিল সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যেসব জিনিসপত্রের চাহিদা রয়েছে, সেগুলো সংগ্রহ করে সরবরাহ করা। বিভিন্ন অফিস যেসব মালামালের জন্য অধিযাচনপত্র দিত, সরবরাহ বিভাগ সেগুলোর জোগান দিত। একবার রেলওয়ের অফিস থেকে ফিশ প্লেটের জন্য অধিযাচনপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন তার কোনো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল না। কর্র্তৃপক্ষ এর জন্য কয়েকবার তাগিদপত্রও দেয়। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ না হওয়ায় অধিযাচনকারী ওই বস্তু সরবরাহের গুরুত্ব ও রেলপথের নাজুক পরিস্থিতির করুণ বিবরণ তাগিদপত্রে তুলে ধরেন। অনন্যোপায় সরবরাহ কর্র্তৃপক্ষ এবার জবাব দিতে বাধ্য হন। তাতে তারা উল্লেখ করেন, তাদের সরবরাহকারীর কাছে ফুল প্লেট, হাফ প্লেট, সল্ট প্লেট, বোন প্লেট সবই আছে; কিন্তু ফিশ প্লেট নেই। এর মধ্যে কোন প্লেট ‘ফিশ প্লেট’ হিসেবে ব্যবহার্য, তা জানালে তারা তা দ্রুত সরবরাহ করতে পারেন।

কাজের প্রাসঙ্গিকতা ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে উল্লিখিত কৌতুকপ্রদ বাস্তব ঘটনাটির অবতারণা করা হয়েছে। Services (Reorganization and Conditions) Act, 1975 প্রণয়ন করা হয়েছে জনস্বার্থ সুসংহত ও সুরক্ষা করার জন্য; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এখানে বিষয় নয়। আইনের এই উদ্দেশ্যের মর্মার্থ বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত অনুধ্যানের মাধ্যমে ক্যাডারগুলোর কাজের উপযোগিতার আলোকে প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন, সমন্বয় ও একীভূতকরণ করার মাধ্যমে অধিকতর জনকল্যাণ ও উন্নতির দ্বার উন্মোচন করা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত