বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ক্রোমভেজের ঋণে নিলাম শিল্প মন্ত্রণালয়ের জমি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:০৮ এএম

শিল্প মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন ঢাকার হাজারীবাগের নর্থইস্ট ট্যানারির ৪৫ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছে বেসরকারি মালিকানাধীন ক্রোমভেজ ট্যানারি। ঋণ দেওয়া অগ্রণী ব্যাংক নিলামে তুলে সরকারের ওই জমি বিক্রিও করে দিয়েছে। বন্ধকী এই সম্পত্তির বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে পারছে না ব্যাংক। নর্থইস্ট ট্যানারির সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়া ও নিলামে বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের শাস্তি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তাগাদা দিচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়।

গত ১৫ দিন ধরে এই ঋণ জালিয়াতি নিয়ে অগ্রণী ব্যাংক ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যোগাযোগ করা হলে তারা কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তাদের কেউ বলছেন, এ বিষয়ে জানা নেই কারও। কেউবা এ ঋণ নিয়ে কথা বলতেই রাজি হন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের অগ্রণী ব্যাংকের আমিন কোর্ট শাখা থেকে ক্রোমভেজ ট্যানারি প্রায় ছয় একর জমি বন্ধক রেখে প্রথম প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ নেয়। সিসি (হাইপো) শ্রেণির এই ঋণ সময়ের ব্যবধানে আরও বাড়াতে থাকেন ট্যানারিটির মালিক সেলিম মোমেন। ঋণ নিলেও শুরু থেকেই খেলাপি হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৪ সালের ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী ক্রোমভেজের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল সাত কোটি ৫৩ লাখ, ৪৮ হাজার টাকা। ২০০৬ সালে সুদাসলে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ৪১ কোটি ২২ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৯৯৭ সালে প্রথম মামলা করে অগ্রণী ব্যাংকের আমিন কোর্ট শাখা। পরে আরও কয়েকটি মামলা করে ব্যাংক। শেষে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেয়। তার মধ্যে ১৭২ শতাংশ ছাড়া বাকি জমি বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রি করা জমিগুলোর সঙ্গে নর্থইস্ট ট্যানারির ৪৫ শতাংশ জমিও বিক্রি করেছে অগ্রণী ব্যাংক। খুরশীদ আলম ও মনিরুজ্জামান নামে দুইজন নিলামে ওই জমি কিনে নিয়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের কাছ থেকে। প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের এই সম্পত্তি অর্ধেকেরও কম মূল্যে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অগ্রণী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ক্রোমভেজের ঋণে নর্থইস্ট ট্যানারির সম্পত্তি বিক্রির খবর ২০১৭ সালে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারে শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০১৮ সালের ১১ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংককে চিঠি দিয়ে সরকারি সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়া ও নিলামে সরকারি সম্পত্তি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের শাস্তি চায় শিল্প মন্ত্রণালয়। তারপর বছরখানেক কেটে গেলেও কারও কোনো শাস্তি হয়নি। বরং নিলামে কেনা ক্রেতাদের সঙ্গে মামলা চলছে শিল্প মন্ত্রণালয় ও অগ্রণী ব্যাংকের।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংককে দেওয়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিরাষ্ট্রীকরণ শাখার তখনকার উপসচিব তানজিনা ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন নর্থইস্ট ট্যানারির সম্পদ বন্ধক রেখে অগ্রণী ব্যাংক ক্রোমভেজ ট্যানারিকে ঋণ দিয়েছে। ওই ঋণ আদায়ের জন্য মামলা করে ওই সম্পত্তি বিক্রি করার চেষ্টা গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হলেও এখনো এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি শিল্প মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। এর আগে দুইবার চিঠি দেওয়ার পর ২০১৮ সালের মার্চের চিঠিতে ঋণ দেওয়া ও সরকারি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির চেষ্টার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে শিল্প মন্ত্রণালয়।

ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ক্রোমভেজের মালিক সেলিম মোমেন ২০১৭ সালে মারা যান। তার মেয়ে সেলিনা মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংক আমাদের অনেক সম্পত্তি বিক্রি করে দিচ্ছে। ওই জমির উপযুক্ত কাগজপত্র ব্যাংকের কাছেও নেই, শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছেও নেই। আমরা ব্যাংকের সঙ্গে অনেকবার আলোচনা করার চেষ্টা করলেও ব্যাংক আগ্রহ দেখায়নি। ক্রোমভেজ ট্যানারি, ব্যাংক ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ১০-১২ বছর আগে ব্যাংক ওই জমি নিলামে তুলে। ওই জমির দাম কমপক্ষে ১৪ কোটি টাকা। ব্যাংক সেটা তিন-চার কোটি টাকায় বিক্রি করছে। এখন শিল্প মন্ত্রণালয় রেজিস্ট্রেশন করে না দিলে ব্যাংক তা ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে পারবে না।

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মালিকপক্ষের হয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। এ বিষয়ে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না।’

অগ্রণী ব্যাংকের আমিন কোর্ট শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক ইকবাল করিম জানান, নিলামে যারা কিনেছেন, তাদের চিঠি দিয়ে টাকা ফেরত নিতে বলেছি। কিন্তু তারা টাকা ফেরত না নিয়ে জমি পেতে চান, সেজন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। শিল্প মন্ত্রণালয় জমির বর্তমান বাজারদর চাচ্ছে। ক্রেতারা চাচ্ছেন আশির দশকে জমির দাম যা ছিল, সেই দরে কিনতে।  আমিন কোর্ট করপোরেট শাখার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. নাজমুল হক এ বিষয়ে জানান, যতটুকু জানি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের আর কোনো লেনদেন নেই। আদালত তা ফয়সালা করে দিয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় তাদের জমি ক্রোমভেজকে বরাদ্দ দিয়েছিল। ওই জমির ওপর ঋণ নেওয়া যাবেÑ এমন শর্তও ছিল। সে কারণেই ব্যাংক ওই জমি বন্ধক রেখে ঋণ দিয়েছে। আদালতের আদেশে নিলামে বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন শিল্প মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র না দেওয়ায় নিলামের ক্রেতাকে তা বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার জানা নেই। তিনি ব্যাংকের ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. ইউসুফ আলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

পরে ইউসুফ আলীর সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাখা থেকে বিস্তারিত জেনে তারপর জানাবেন তিনি। পরে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে কল করলেও রিসিভ করেননি।

শিল্প মন্ত্রণালয় সচিব মো আবদুল হালিমও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। মন্ত্রণালয়ের বিরাষ্ট্রীকরণ শাখার উপসচিব মো. খলিকুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন সচিব। পরে খলিকুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমিসংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ই অনেক ঝামেলার। একেকটা সমস্যা নিষ্পত্তি হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লেগে যায়। এর বেশিও লাগতে পারে। এটা কারও একার কাজ নয়। এই মামলা সম্পর্কে আমি যতদূর জানি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের একটি মিটিং হওয়ার কথা আছে। মিটিং হলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাতে পারবে। তার আগে এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত