সিলেট মেরিন একাডেমি ভবন

নির্মাণ শেষের আগেই ফাটল

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৫২ এএম

সিলেটে নির্মাণাধীন মেরিটাইম একাডেমির প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ভবনটির বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। ভবনটির নিচতলার বিভিন্ন পার্টিশন দেয়ালে এই ফাটল দেখা গিয়েছে, এমনকি হেয়ার ক্র্যাক (সূক্ষ্ম ফাটল) দৃশ্যমান হয়েছে ভবনের কলামেও। এ ছাড়া অন্য একটি ভবনের বাইরের দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণও পড়েছে। ভবনগুলোর স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা ‘বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’ (আইএমইডি)। ভবনটি নির্মাণে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। এসব গাফিলতির জন্য দায়ীদের শাস্তি দিতে সুপারিশ করেছে সরকারের এই বিভাগটি।      

সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে দেশে নতুন করে চারটি মেরিটাইম একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার। বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও পাবনায় এসব একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এরই মধ্যে তিন দফায় প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়েছে অর্ধেক। আর এই অর্ধেক কাজের মধ্যেই চরম অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। দ্রুত এই অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে আইএমইডি। আইএমইডির এই সুপারিশের পর এখন তড়িঘড়ি করে সভা ডেকে ত্রুটি দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চারটি মেরিটাইম একাডেমি নির্মাণে একটি প্রকল্প ২০১২ সালে অনুমোদন পায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সিলেটে। সম্প্রতি আইএমইডির উপপরিচালক মুহাম্মদ মুস্তফা হাসানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সিলেটের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। এ সময় ভবনটির নির্মাণকাজে নানা অনিয়ম ও মানহীন কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিদর্শনে ছয়তলা ভিতবিশিষ্ট চারতলা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় পার্টিশনের দেয়ালে ফাটল ও কলামে হেয়ার ক্র্যাক দেখা যায়। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ছাত্রাবাস ভবনের বাইরের দেয়ালে শেওলা পড়া অবস্থায় দেখতে পায় পরিদর্শন দল। এতে ওই দেয়ালের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।

আইএমইডি কর্মকর্তারা জানান, ২০১২ সালে চারটি মেরিটাইম একাডেমি প্রতিষ্ঠায় ব্যয় ধরা হয় ৪৪০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের জুন নাগাদ এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের গতি না থাকায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি মেয়াদও এক বছর বাড়ানো হয়। তখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮৫ কোটি টাকায়। পরে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৭ সালে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় আবারও বাড়ানো হয়। বাড়তি মেয়াদে ৫২১ কোটি টাকায় প্রকল্পটি চলতি বছরের জুন নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ হিসাবে প্রকল্পের মেয়াদকাল মোটে চার মাস বাকি থাকলেও কাজ বাকি রয়েছে ৪০ শতাংশ। এমনকি প্রকল্পের মসজিদ, সুইমিং পুল, প্যারেড স্কয়ার, পাম্প হাউস, কম্পাউন্ড ড্রেন, আরসিসি পিলার, সীমানা প্রাচীর, এপ্রোচ রোড ও গ্যারেজ নির্মাণসহ বেশ কিছু কাজের দরপত্র এখনো হয়নি। নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে কাজের গতি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান আইএমইডির এক কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইএমইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মানহীন কাজের বিষয়ে বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের উদ্বোধন না হতেই ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এতেই বোঝা যায় কাজের মান কতটা খারাপ হয়েছে।’

ব্যাখ্যার জবাব দিতে এক মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কাজ ত্রুটিমুক্ত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেটাও জানাতে বলা হয়েছে।’

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রফিক আহমদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফাটল ও ক্র্যাকের বিষয়ে আমরা অবশ্যই পদক্ষেপ নেব। এ জন্য গত বৃহস্পতিবার আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি যৌথ সভা করেছি। কীভাবে ত্রুটি দূর করা যায় তা তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটের মাটি ও ঠিকাদার দুটিই সমস্যা। অন্য তিন জায়গাতে এমন সমস্যা নেই। প্রকল্পটির কাজের মান ঠিক হয়েছে কি না, এটা নিশ্চিত করতে একটি কমিটি করেছি। সেই কমিটি সুপারিশ করলেই ভবনগুলো বুঝে নেওয়া হবে। ৪০ ভাগ কাজ বাকি থাকলেও আমরা বাকি সময়ে কাজ শেষ করতে পারব।’

গত বছরের নভেম্বরে প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পাওয়ার কথা জানিয়ে রফিক আহমদ বলেন, ‘এখন কাজের গতি বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করি সুফল পাওয়া যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত