ফুলের গন্ধে চমক লেগে...

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৯, ০২:১৩ এএম

ফাগুন-সন্ধ্যায় ঘাস বিছানো পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নাকে লাগল অপূর্ব মিষ্টি গন্ধ। বাতাস তখন আনন্দ-সৌরভে মাতোয়ারা। থমকে দাঁড়িয়ে ঘ্রাণের উৎস খুঁজতে শুরু করি। আলো-আঁধারিতে বুঝতে পারি, সুগন্ধ আসছে আমাদের চিরচেনা জাম্বুরা বা বাতাবি লেবুর ফুল থেকে। রাত্রিনামা অন্ধকারে চার-পাঁচ পাপড়ির সাদা ফুল যেন আলোকজ্বলা বাতি। ফল ও গাছ খুব চেনা হলেও এর ফুলের এমন বাতাস মাতাল করা সুরভি আগে কখনো অনুভবে ধরা পড়েনি। এক যুগ কংক্রিটের নগরে কাটানো আমার কাছে নিজ গ্রামের সেই সন্ধ্যাটা তাই ধরা দিল ভিন্ন মহিমায়। মনে হলো, নাগরিক ব্যস্ততার ফাঁকে পল্লীমায়ের কোলে ক’দিনের অবকাশ যাপনের আয়োজন সার্থক। এমন কোনো সুবাসমাখা রাতেই হয়ত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী লিখেছিলেন, ‘পুকুর ধারে লেবুর তলে/থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে/ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’ (কাজলা দিদি)।

এই বসন্ত দিনে কোকিলের কুহুতানে মুখর গ্রামবাংলায় যে ফুলটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে সেটি হলো ভাঁটফুল। ঘেঁটু নামেও এটি পরিচিত। বনে-পাহাড়ে, পথের ধারে, ঝোপঝাড়ে এখন এই ফুলের ছড়াছড়ি। কবিগুরুর ভাষায়, ‘আশে-পাশে ভাঁটিফুল ফুটিয়া রয়েছে দলে দলে’ (অপঘাত)। সবুজপাতার মাঝে ঝাড়বাতির মতো মাথা উঁচিয়ে রাখে ভাঁট। দেশের সর্বত্র এটি প্রাকৃতিকভাবেই ফোটে। পাঁচটি সাদা পাপড়ির মাঝে বেগুনি রঙের ছটা। মাঝখানে লম্বা কেশরগুচ্ছ। কাছে গেলে টের পাওয়া যায় সুগন্ধ। বাংলার একান্ত নিজস্ব এই ফুল গ্রীষ্ম পর্যন্ত বন-বাদাড়ে রং ছড়িয়ে যায়। সাধারণের কাছে তেমন কদর না পেলেও ভাঁটের অনন্য রূপ ধরা পড়েছে জীবনানন্দ দাশের

কবিতায়। তার একাধিক চরণে-পঙক্তিতে খুঁজে পাই এর সৌরভ। যেমনÑ ‘সাদা ভাঁট পুষ্পের তোড়া/ আলোকলতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণ ফুল বাসকের গায়।’ ভাঁটের নাম জড়িয়ে আছে হিন্দু দেবতা ঘণ্টাকর্ণের সঙ্গে। তাই পূজা-পার্বণে এটি কাজে লাগে। এর ঔষধি গুণও কম নয়।

এদিকে লেবুজাতীয় ফলের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাম্বুরা। এর আদিভূমি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ধারণা করা হয়, বাটাভিয়া (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা) থেকে এসেছে বলে এর নাম বাতাবি লেবু। ফুলের গড়নে এটি কামিনীর কাছাকাছি, গন্ধও তাই। ভোগবাদী দৃষ্টিতে জাম্বুরার ফুল মানুষের নজর এড়ালেও এর রূপ-গুণের কথা জানে মৌমাছি, প্রজাপতি ও পাখিরা। তাই ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায় ওরা। পরাগায়নও ঘটে ওদের মাধ্যমে।

ঝরাপাতার দিন শেষে ফাগুন পেরিয়ে চৈত্র এলেও পল্লীগাঁয়ে অনেক গাছই এখনো পাতাশূন্য। পলাশের নিষ্পত্র ডালে শিমের মতো ফলের প্রাচুর্য। মেঘশিরীষ, দেবদারু, নিমের শাখায় শাখায় কচিপাতার নাচন। গন্ধ নেই তবু রঙের শোভায় দৃষ্টি কাড়ে জলার ধারের ডোলকলমি, পাহাড়-টিলায় দাঁতরাঙা ও নাগবল্লী ফুল। মাঠে মাঠে কচি ধানের চারায় দখিন হাওয়ার দোল। সব মিলিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে এখন বাঁধভাঙা বসন্ত উচ্ছ্বাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত