স্বাস্থ্যবান জাতি

সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠুক

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০২:৫১ এএম

‘যার স্বাস্থ্য আছে, তার আশা আছে এবং যার আশা আছে, তার সবকিছুই আছে’ এই আরবি প্রবাদটির মর্মার্থের মধ্যে গভীরতা অনুধাবনে অনুভব করা দুরূহ নয় এর শক্তি ও বাস্তবতা। ১২ জুন দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জোর দিয়ে স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে নেওয়া হচ্ছে পাঁচ পদক্ষেপ। টেকসই উন্নয়ন, সমৃদ্ধ দেশ ও সমাজ বিনির্মাণে সুস্থ-সবল জাতি অপরিহার্য। আধুনিক বিশে^র উন্নত এমনকি উন্নয়নশীল দেশেও দেশের জনগণকে বোঝা মনে না করে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার নানামাত্রিক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। এর পূর্বশর্ত হিসেবে জোর দেওয়া হয়েছে মানুষের শারীরিক-মানসিক সুস্থতার দিকে। বিলম্বে হলেও আমাদের সরকার এ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিয়েছে এবং তা সাধুবাদযোগ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসাকেন্দ্রিক থেকে রোগ প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদারকরণ, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসাশিল্পের বিকাশ ঘটানো এই পাঁচটি বিষয়কে সামনে রেখে সরকার এ ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এর কোনো বিকল্প নেই। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায়ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণের জন্য সেই নিরিখে বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। আমরা জানি, দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থার পথ কতটা অমসৃণ। অনেক মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থা আরও নাজুক। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে সরকারের ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও আমরা জানি। সরকারের এই উদ্যোগকেও আমরা স্বাগত জানাই।

সরকারি হাসপাতালে নানারকম সংকট-সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রয়েছে অনিয়মের দীর্ঘ খতিয়ান। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে  চিত্র আরও প্রকট। ওষুধসহ চিকিৎসা সামগ্রীর দামও সিংহভাগ মানুষের নাগালের বাইরে। উল্লেখযোগ্য সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাব্যবস্থার পথ সুগম না হাওয়ায় এর সুযোগে মহানগর-নগর-শহর এমনকি উপজেলা পর্যন্ত ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং এর অধিকাংশই মান উত্তীর্ণ নয়, বরং ভুল আর অপচিকিৎসার যেন একেকটি ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’। কোনো কোনো কথিত নামিদামি হাসপাতালও এর বাইরে নয়। চিকিৎসার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। এমতাবস্থায় সুস্থ জাতি গঠনের প্রত্যয় অত্যন্ত সময়োপযোগী, একই সঙ্গে অনেক বড় চ্যালেঞ্জও। আমরা জানি, সরকার ইতিমধ্যে বিশেষায়িত চিকিৎসার পথ সহজ ও চিকিৎসা সামগ্রীর দাম কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। হার্টের রিংসহ আরও কিছু সামগ্রীর দাম কমিয়েছে। ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এবং মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা মনে করি, ব্যবস্থা নেওয়াই শেষ কথা নয়, ব্যবস্থার কার্যকর সুফল সেবাপ্রার্থীরা পাচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য সার্বক্ষণিক জোরদার তদারকি দরকার।  আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অতীতে অনেক জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা ভেস্তে গেছে যথাযথ তদারকির অভাবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়কে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবলে চলবে না, এটি বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির জন্য অতীব জরুরি।

উইনস্টল চার্চিল বলেছিলেন, ‘স্বাস্থ্যবান নাগরিকরাই কোনো দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ’। সুস্থ নাগরিকরাই একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও গতিশীল সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেন। স্বাস্থ্য খাতে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জবাবদিহি এবং প্রতিকারমূলক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জোর দেওয়া নিশ্চয় সময়ের দাবি। সঠিক নীতি, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব। বিদ্যমান বাস্তবতায় সুস্থ জাতি গঠনের চ্যালেঞ্জ কেবল জীবন রক্ষা নয়; বরং মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এখন শুধু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বই নয়, এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক ও জাতীয় বিনিয়োগও। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত