গ্রামের জন্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ১০:২৩ পিএম

একটা সময় ছিল যখন গ্রাম বললেই মনে হতো ‘গোলা ভরা ধান, আর গোয়াল ভরা গরু’। গ্রামগুলো ছিল সবুজে ভরপুর। সবুজ ক্ষেতের পাশ ধরে ঝিরি ঝিরি বাতাসে মেঠোপথ দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি। কারণ গ্রামগুলোও আজ শহরের দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিতভাবে গ্রামের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি, এমনকি একশ্রেণির লোকজন গ্রামের সুবিশাল সবুজ মাঠ কমমূল্যে কিনে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলছে কলকারখানা। ধানি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারণে গ্রামের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সবাই তাদের বাড়ি পাকা করছে। এখানে পাকা বলতে বাড়িগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইটের দেয়াল এবং ওপরে টিনের দ্বারা তৈরি হচ্ছে। এমনকি পাঁচ-ছয় তলা বাড়িও এখন গ্রামে খুব সহজলভ্য বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এক্ষেত্রে নির্মাণ বিধিমালা মানা হচ্ছে না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তাছাড়া এ কথা বলা বাহুল্য যে, আমাদের দেশে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদসহ গ্রামগুলোর জন্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালার স্বতন্ত্র কোনো নিয়ম নেই যা গ্রামগুলোর স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে শহরের জন্য প্রযোজ্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সমরূপ নিয়মনীতি দিয়েই সব ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেখানে শুধু প্রকল্পের চারপাশে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে সেটাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যার কারণে হয়তো আজ থেকে কয়েক বছর পরে আমরা গ্রাম নামক এখনকার ধারণাটিরও আর কোনো নমুনা দেখতে পাব না। তাছাড়া বর্তমান সময়ে আরও একটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত, সেটি হচ্ছে শহরগুলোর মতো করে মফস্বলেও ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এমন গৃহনির্মাণের রূপরেখা এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে।

বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে আবাসন সমস্যা অবশ্যই আমাদের একটি বড় সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার কারণে যদি গ্রামগুলোতেও শহরের মতো অপরিকল্পিত অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়, কিংবা সকল খাসজমি যদি প্রাইভেট সেক্টরে চলে যায় তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য খোলা সবুজ মাঠ, পুকুর, ধানি-জমিও শেষ হয়ে যাবে এবং আগামী দশকের মধ্যে কমিউনিটি স্পেস বলে আর কিছুই থাকবে না। শুধু তাই নয়, অবকাঠামো নির্মাণে গ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ কোনো নীতিমালা না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে গ্রামের পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ছে।

বিগত এক দশকের হিসাব থেকে দেখা যায়, গ্রামগুলোর অবস্থা খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে। আমাদের দেশে ভূমি আইনে

কৃষিজমিতে কোনো প্রকার আবাসন কিংবা কোনো প্রকার স্থাপনা তৈরির নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কে শোনে কার কথা? সবই চলছে সমানতালে! এমনকি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষসমূহের আওতাবহির্ভূত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত এলাকায় কোনো ধরনের ইমারত নকশা অনুমোদনের জন্য এগারো জনের একটি কমিটির কথাও বলা হয়েছে বিধিমালায়। যেখানে পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) থেকে শুরু করে স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদসহ অন্যরা উপস্থিত থাকবেন এবং নকশার জন্য বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করবেন। যদিও গ্রামে একটি স্থাপত্যের কোন কোন বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে নির্দিষ্ট করে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনাই নেই এই বিধিমালায়। তবে, যা আছে সেই নিয়মগুলোও সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না স্থানীয়ভাবে। উক্ত বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না সেটি যাচাই-বাছাই করার জন্য একটি মনিটরিং টিম কাজ করবে। এমনকি নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়ির মালিকরা নির্মাণ প্রতিবেদন কমিটির কাছে জমা দেবেন এবং কমিটিকে নিশ্চিত করবেন। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এই সকল নিয়ম আমাদের দেশের মফস্বল কিংবা গ্রামগুলোতে কি আদৌ মানা হচ্ছে? আর যদি মানা না হয় তাহলে এই অনিয়মের জবাবদিহি কে করবে?

এবার আসি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভুটানের কথায়। ‘গ্রাম্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০১৩’ নামে তাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য আলাদা একটি বিধিমালা রয়েছে। সেখানে কর্র্তৃপক্ষ স্বাক্ষরিত প্রথম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে গ্রামের পরিকল্পিত ল্যান্ডস্কেপ, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, আবাসন ইত্যাদি বর্তমান মডার্ন অপরিকল্পিত উন্নয়নের থেকে রক্ষার জন্যই বিশেষ করে এই নীতিমালা। এমনকি এই নীতিমালার মাধ্যমে গ্রামের মানুষের সুখ-শান্তি, স্বাস্থ্য, অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। সেই নীতিমালার মধ্যে মফস্বল কিংবা গ্রামের ঘর বাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে সমন্বিত আবাসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের জমিগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহার কীভাবে করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব সেগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি গ্রামের প্রাকৃতিক জায়গাগুলোকে সংরক্ষণ এবং গভীর ও অগভীর জলাশয় কীভাবে রক্ষা করা যায় সেটিও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এতে। ভুটানের এই বিধিমালাতে বর্তমানে আছে এমন খোলা জায়গা, খেলার মাঠ যেখানে বিভিন্ন সময়ে জনসমাগম হয়, সেগুলোকে বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। যে কোনো পাবলিক কিংবা প্রাইভেট জমিতে কোনো উন্নয়ন করতে চাইলে গ্রামগুলোতেও সাধারণ জনগণের জন্য কমিউনিটি স্পেস রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বিধিমালায় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে আমরা কি আমাদের শহরের জন্য প্রযোজ্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা দিয়েই গ্রাম উন্নয়নের কথা ভাবব? নাকি গ্রামের টেকসই উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র ‘গ্রাম উন্নয়ন নীতিমালা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ প্রণয়নের দিকে এগোবো আমরা? বিষয়টি একটু ভাববেন কি! গ্রামে যদি প্রাইভেটাইজেশনের কারণে দ্রুতগতিতে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণ চলতে থাকে, তাহলে আগামী অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামগুলো কংক্রিটের জঞ্জালে ভরে উঠবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার আগেই প্রয়োজন সঠিক কর্মপরিকল্পনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত