শিবির নেতা জিসানকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে হট্টগোল

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:২০ এএম

জাতীয় সংসদে গতকাল রবিবার নারী ধর্ষণ ও জোর করে ভ্রুণ নষ্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার ছাত্রশিবির নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দল মন্ত্রীর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার আহ্বান জানালে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে রুলিং দেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।

এদিন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার জন্য দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই বিবৃতি শেষ হওয়ার পর তিনি আরেকটি বিবৃতি দেওয়ার জন্য স্পিকারের অনুমোদন চান। জবাবে স্পিকার বলেন, ‘যদি আরেকটা এ রকম গ্রেট নিউজ থাকে তাহলে অফকোর্স অ্যালাউড।’

কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একটা বিষয়ে কিছু ক্লেইম করা হয়েছে সে জন্য বিবৃতি দিচ্ছি।’ এরপর তিনি জিসান মিয়ার গ্রেপ্তারের বিষয়ে বলেন, পুলিশের তথ্যমতে, জিসান মিয়া এক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন। ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জোর করে গর্ভপাত করানো হয়। পরে নারীটিকে বিয়ে করার কথা দিলেও টালবাহানা করেন এবং আত্মগোপনে চলে যান।

জিসানকে গ্রেপ্তার ও মামলার বিবরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে অনেকেই ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তার নিখোঁজের বিষয়টি অন্যভাবে বর্ণনা করে সরকারকে দায়ী করতে চেয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পরে আমরা মনে করলাম এই ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা দরকার। তাই আমি এই মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এটা প্রকাশ করলাম।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুটি বিবৃতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান ৩০০ বিধিতে একটি বিবৃতি দেওয়ার নিয়ম। এ সময় স্পিকার বলেন, ৩০০ বিধি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই করতে থাকেন। স্পিকার তখন বিরোধীদলীয় উপনেতাকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো একটি দলকে লক্ষ্য করে একটি বিতর্কিত বিষয়ে এভাবে বক্তব্য রাখা বোধ হয় বাংলাদেশের পার্লামেন্ট ইতিহাসে এই প্রথম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি দলকে কনডেম করার জন্যে ইনটেনশনালি এটা এখানে উপস্থাপন করেছেন। আমি জানতে চাচ্ছি, জিসান এখন কোথায় আছে? কুমিল্লার পুলিশ জিসানের সঙ্গে কারও কথা বলতে এমনকি সাংবাদিকদের কথা বলতে দিচ্ছে না। যে মেয়েটার কথা বলা হয়েছে ওই মেয়েটার সঙ্গেও কাউকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এটা কেন এখানে (সংসদে)? কি কোনো প্লট তৈরি হচ্ছে? আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে চান।

এ পর্যায়ে স্পিকার বলেন, এটা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ জায়গা। আমরা সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেব। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব যদি সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে কিছু হয়ে থাকে সেটা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়।

এদিকে জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ২০০১ সালে একটি দাওয়াত অনুষ্ঠানে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। যে অনুষ্ঠানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরও তার স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। কিছুটা হাস্যরস করে মনিরুল হক বলেন, ‘আমি বউ নিয়ে যাইনি, কয়েকজন যায়নি। কিন্তু তাহের ভাই বউ নিয়ে গেছেন। ঢুকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি তাহের ভাই ভাবি কই? উনি বলেন, ‘এই যে’! তখন বলি, ‘আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই এটা কেমনে বুঝব?’

নারী এমপিদের উদ্দেশে মনিরুল হক বলেন, ‘সবাই মেধাবী। দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?... আপনারা (বিরোধী দল) এদিকে (সরকারি দল) দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কি আছে বুঝব না, এটা ঠিক না।’ বিএনপির এমপিরা এ সময় টেবিল চাপড়ে সমর্থন করেন। হাস্যরস সৃষ্টি হয়। এ সময় ডেপুটি স্পিকার মনিরুল হক চৌধুরীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হলো।’ তখন বিরোধীদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান মনিরুল হক চৌধুরীও।

আসরের নামাজের বিরতির পর বিরোধী দল আবারও প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মনিরুল হক চৌধুরী বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, তা অমার্জনীয় অপরাধ। বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে যেসব কথা বলছেন, তা ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন। হীন বর্ণবাদী বক্তব্য দিয়েছেন।’

জান্নাতের টিকিট বিলাইয়া কেমনে ধর্ষণ করলা? : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পুরক বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম বাজারে মাঝে মাঝে ন্যারেটিভ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে জান্নাতের সোল এজেন্ট নাকি একটা ওজন মাপার পাল্লা, নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ। জান্নাতের টিকিট বিলাইয়া কেমনে ধর্ষণ করলা? আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ।

সীমান্তে পুশইন আলোচনা স্থগিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন : অধিবেশনে ভারত সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রস্তাবিত বিশেষ আলোচনা স্থগিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি কেবল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। বর্তমানে বাজেট অধিবেশন চলায় সময়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সময়ে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত