সৌন্দর্যের আড়ালে হাহাকার ১০ হাজার মানুষের

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:২৫ এএম

নীল জলরাশির মধ্যে জেগে থাকা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন যেন এক নীরব কান্নার জনপদ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের আড়ালে এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন এখন চরম সংকটে। একদিকে পরিবেশ রক্ষার তাগিদে সরকারের ৯ মাসের দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে সাগরে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের আরাকান আর্মির অপহরণ ভয়ে সাগরে মাছ শিকারে যাচ্ছেন না জেলেরা। এই জোড়া ধাক্কায় দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার মানুষের আয়ের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় দ্বীপজুড়ে চলছে জীবিকা নির্বাহের তীব্র হাহাকার।

সেন্টমার্টিনের স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পর্যটন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কারণে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দ্বীপে পর্যটক আগমন ও রাত্রিযাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে দ্বীপের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। দ্বীপের প্রায় ২৩০টিরও বেশি হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ এখন তালাবদ্ধ। হোটেল কর্মচারী, ট্যুর গাইড, ডাব বিক্রেতা, নৌযান শ্রমিক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জেলেরা এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটন মৌসুমে আগে ৬ মাস পর্যটক আসায় যে আয় হতো তা দিয়ে বছরের বাকি সময় সংসার চলত, এখন তা প্রায় বন্ধ। বর্তমানে ২ মাস পর্যটক না আসায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে রয়েছেন। পাশাপাশি, সব শ্রেণির শ্রমজীবীরাও কষ্টে দিনযাপন করছেন। কেউ ধার-দেনা করে দিন পার করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প কাজের সন্ধানে মূল ভূখ-ে পাড়ি জমাচ্ছেন।

সেন্টমার্টিন বিচ ইকো রিসোর্টের মালিক মো. জসিম উদ্দিন শুভ বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বীপের হোটেল মালিকরা চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একসময় পর্যটকদের কোলাহলে মুখর থাকা হোটেলগুলো এখন প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। কক্ষগুলোতে নেই বুকিং, নেই আগের মতো অতিথিদের আনাগোনা। ফলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিকদের মাথায় যেন নেমে এসেছে এক অদৃশ্য বোঝা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে সেন্টমার্টিনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনে চরম দুর্ভিক্ষ ও মানবিক সংকট নেমে এসেছে। দ্বীপবাসীর এই দুরবস্থার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

পর্যটন বন্ধ হওয়ার পর দ্বীপের বাসিন্দাদের টিকে থাকার শেষ অবলম্বন ছিল সাগরে মাছ ধরা। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাগরে মাছের প্রজনন মৌসুম এবং সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সাগরে মাছ ধরাও গত ৫৮ দিন টানা বন্ধ ছিল। এরপর গত ১১ জুন সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও মিয়ানমারের আরকান আর্মির অপহরণের ভয়ে সাগরে মাছ শিকারে যাচ্ছেন না জেলেরা। মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাগুলো মাসের পর মাস ঘাটেই নোঙর করে অলস পড়ে আছে। আয়ের দুটি প্রধান উৎস এক সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

দ্বীপে চাল, ডালসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম মূল ভূখ-ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কোনো আয়-রোজগার না থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, দ্বীপের বহু হতদরিদ্র পরিবার এখন দিনে মাত্র একবেলা খেয়ে বা আধা-পেটা খেয়ে দিন পার করছে। জীবন ধারণের তাগিদে সামর্থ্যবান অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে টেকনাফ, উখিয়া বা কক্সবাজারে গিয়ে দিনমজুরি বা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন।

দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, পরিবেশ রক্ষা করা অবশ্যই জরুরি, তবে দ্বীপের মানুষকে না খাইয়ে নয়। সরকারের পক্ষ থেকে সেন্টমার্টিনবাসীর জন্য পর্যাপ্ত রেশন বা দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না হলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। দ্বীপবাসী বাঁচতে চান এবং তারা তাদের এই অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, ‘দ্বীপবাসী আজ অভাব-অনটনে দিন পার করছেন। জীববৈচিত্র্য রক্ষা হোক, কিন্তু মানুষের জীবন চলার পথ বন্ধ করে নয়। অন্তত ১০ হাজার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে পর্যটন বন্ধ রাখা যুক্তিসংগত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমল থেকেই দ্বীপ নিয়ে নানা গুজব চলছে। এখন কর্মহীনতা সেই গুজবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পর্যটন ও জেলেনির্ভর এ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক, জেলেদের মাছ শিকার বন্ধ থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। দ্বীপের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ পর্যটনের সঙ্গে জড়িত, তারা এখন সবাই বেকার। এছাড়া দ্বীপে ১৬০০-এর বেশি জেলে রয়েছেন, তারাও চরম কষ্টে আছেন।’

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম অনীক চৌধুরী জানান, সেন্টমার্টিনে পর্যটন সীমিত করার ফলে তৈরি হওয়া বেকারত্ব দূর করতে স্থানীয়দের জন্য সিউইড, মাশরুম, সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং নারীদের জন্য সেলাই ও হস্তশিল্পের মতো বিকল্প আয়ের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত