আষাঢ়ের উচ্ছ্বাস

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৯ এএম

‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘আষাঢ়’ বাংলা সনের তৃতীয় এবং বর্ষাকালের প্রথম মাস। জুন মাসের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এ মাসে, প্রকৃতি যেন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। হঠাৎ আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকে, চমকায় বিজলি। কানে আসে বজ্রপাতের গগনবিদারি শব্দ। অবিরাম বৃষ্টিতে জলে পরিপূর্ণ হয় খাল-বিল। এই সময়ে বর্ষার বার্তা নিয়ে ফোটে কদম ফুল, যা বাঙালির হৃদয়ে গভীর নস্টালজিয়া ও রোমান্টিকতা সৃষ্টি করে। মেঘের গর্জন, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ আর কদমের মিষ্টি সুবাস যেন ভিন্ন রূপ দেয় আষাঢ়ের বৈচিত্র্যকে। শুধু প্রকৃতিকে নয়, আষাঢ়ের বৃষ্টি মানব হৃদয়কেও সিক্ত করে; যে কারণে আষাঢ় মাসের বর্ষা, আমাদের জীবনের এক অনন্য অধ্যায়।

প্রশ্ন আসে, কীভাবে পেলাম আষাঢ় মাস? জানা যাচ্ছে আকাশে তারার অবস্থান এবং প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, নাম এসেছে আষাঢ়ের। সূর্যের অবস্থান যখন ‘পূর্বাষাঢ়া’ ও ‘উত্তরাষাঢ়া’ নক্ষত্রে থাকে, তখন সেই সময়কে ‘আষাঢ়’ মাস হিসেবে ধরা হয়। ঋতুচক্রে সূর্য যখন মিথুন রাশি থেকে কর্কট রাশিতে প্রবেশ করে, তখন বাংলা সনের তৃতীয় মাস হিসেবে আষাঢ়ের শুরু।

জ্যৈষ্ঠের প্রচন্ড খরতাপে রুক্ষ প্রকৃতি সজীব হয়ে ওঠে বর্ষাবর্ষণের মৃদঙ্গ-ছোঁয়ায়। বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি, ইলিশ মাছ, ভর্তা ও ভাজা খাবার থাকে বাঙালির তালিকার উপরের গ্রাফে। এই মাস বাংলার সংস্কৃতি, কৃষি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আষাঢ়ের বৃষ্টি শুধু প্রকৃতিকে নয়, মানব হৃদয়কেও সিক্ত করে। তাই আষাঢ়ের বর্ষা আমাদের জীবনের অনন্য অধ্যায়। বর্ষার সঙ্গে ভিন্ন ঋতুর তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘ঋতুর মধ্যে বর্ষা কেবল একা একমাত্র। তাহার জুড়ি নাই। গ্রীষ্মের সঙ্গে তাহার মিল হয় না; গ্রীষ্ম দরিদ্র, সে ধনী। শরতের সঙ্গেও তাহার মিল হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কেননা শরৎ তাহারই সমস্ত সম্পত্তি নিলাম করাইয়া নিজের নদীনালা মাঠঘাটে বেনামি করিয়া রাখিয়াছে। যে ঋণী, সে কৃতজ্ঞ নহে।’

রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, ‘বর্ষা কবিদের ঋতু।’ শুধু রবীন্দ্র নয়, কাজী নজরুল ইসলাম ও বুদ্ধদেব বসুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। এ সময় প্রকৃতির বিচিত্রিতা আমাদের ক্লান্ত করে। আমরা আপ্লুত হই, প্রকৃতির ভিন্ন রূপ ও সোঁদা গন্ধে। ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ মহাকবি কালিদাসের স্মৃতিবিজড়িত। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ কালিদাসের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়।

বর্ষা মেঘ-মেদুর দিবসের ছায়ালোকে সজল মেঘের শ্যামলকান্তি অতুল রূপের ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত আষাঢ়। বর্ষণসিক্ত গ্রামবাংলার সবুজ প্রকৃতি হয়ে ওঠে নয়নাভিরাম। মাটির উর্বরা শক্তির সঙ্গে, সৃষ্টির প্রতীক্ষা উপেক্ষা করা কঠিন। ফলে কৃষকের কাছে আবাদি ঋতু বর্ষা। হয়তো এ কারণেই নতুনের জন্য উদযাপন করতে হয় ‘বর্ষামঙ্গল’। বর্ষাকে প্রকৃত অর্থে বলা হয়, প্রকৃতির রানি। জ্যৈষ্ঠের খরতাপে দগ্ধ যখন মর্ত্যরে চতুর্দিক, উষ্ণতায় যখন প্রাণ অতিষ্ঠ, ওষ্ঠাগত; ঠিক তখনই নেমে আসে প্রশান্তি আর স্বস্তির পালা। বর্ষণের ভোর, প্রভাত, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ন, সন্ধ্যা কিংবা নিশি-অঝোর বারিধারায় কেবল বয়ে যায় বর্ষণ ধ্বনি। যে কারণে বাঙালির জীবনে আষাঢ় মাস এক মধুর সময়। সুনির্মল বসুর ‘আষাঢ়ের ভোর রাত’ কবিতার মতো বলা যায় ‘ঘন-ঘোর আষাঢ়ের প্রথম প্রকাশ/থমথমে আকাশের নব-উচ্ছ্বাস।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত