আইন করে জঙ্গিবাদ, যৌন নিপীড়ক ও সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিসহ কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলা ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাসহ সন্ত্রাস, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব সংসদ, সরকার এবং নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে আনা একটি সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সংসদ সদস্যরা এ দাবি জানান।
সংসদ সদস্যরা বলেন, ‘ধর্মের নামে পুরো বিশ্বে রক্তের হোলি খেলা চলছে। বাংলাদেশেও নুসরাত হত্যাসহ নানা সামাজিক অবক্ষয় ঘটিয়ে সরকারের ব্যাপক অর্জনকে মøান করার ষড়যন্ত্র চলছে। আইন করে জঙ্গিসহ যৌন নিপীড়ক ও সামাজিক অবক্ষয়ে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিসহ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এসব বন্ধ হবে না।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ সংসদে এ প্রস্তাব আনেন। ১৪৪ (১) বিধিতে আনা এ প্রস্তাবে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ ও শ্রীলঙ্কার গির্জা, হোটেলে সন্ত্রাসী হামলায় সংসদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির নাতি জায়ান চৌধুরীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা ও আহত এবং ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন ও পুড়িয়ে মারার ঘটনায় গভীর ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে এবং এসব সন্ত্রাস, যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের সংসদ, সরকার ও নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।’
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘নুসরাতকে পুড়িয়ে মারতে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষকরা হলেন বাবার মতো। ছাত্ররাও শিক্ষকদের পিতার মতো শ্রদ্ধা করত। কোথায় সেই দিনটি হারিয়ে গেছে? নুসরাত ঘটনার পরও শিশুরা নির্যাতনের শিকার কীভাবে হয়?’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এত বিশাল উন্নয়নকে আমরা মøান করে দিতে পারি না। এসবে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এমন একটি আইন করতে হবে, যাতে এক বা দেড় মাসের মধ্যে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘ধর্মের নামে পুরো বিশ্বে যেন রক্তের হোলি খেলা শুরু হয়েছে। ধর্মের নামে একজন আরেকজনকে হত্যা করছে।’
সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম আবেগঘন কণ্ঠে শ্রীলঙ্কার বোমা হামলায় নিহত তার নাতি শিশু জায়ান চৌধুরীর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘জায়ান নিষ্পাপ শিশু, কী অন্যায় সে করেছিল। আমার মেয়েটার বাচ্চাই (সন্তান) হলো তার পৃথিবী। তার বুকের ধন এভাবে কেড়ে নিল, এটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জায়ান লেখাপড়া করত, কোরআন পড়ত, এত সুন্দর কণ্ঠে পড়ত মনে হতো উচ্চমানের হাফেজ। ক্রিকেট খেলত, লাল রঙের জামা পরতে ভালোবাসত। তাকে হত্যা করে এরা কী পেল?’
শেখ সেলিম বলেন, ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ আজ সব ধর্মকে বিতর্কিত করছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ সারা বিশ্বে মানবতার শত্রু। যারা এটা করছে তাদের মানবতা কোথায়? এখন সময় এসেছে গোটা পৃথিবীকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। ফেনীর নুসরাতকে কীভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এরা কি মানুষ, এরা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। একটা আইন করা উচিত, এক মাসের মধ্যে বিচার করে এদের ফাঁসি দেওয়ার।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশ আজ নিরাপদ নয়। নিরাপদ করতে হলে বৈশ্বিক সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কায় জায়ানসহ ৪৫ জন শিশু ধর্মের নামে হিংসার বলি হলো। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কেউই এ হিংসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের ফলেই সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী আক্রমণের ঘটনা ঘটে। নুসরাত হত্যা কেবল একটি সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়।’
আলোচনায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মতিয়া চৌধুরী, জাসদের শিরিন আখতার, সংরক্ষিত নারী আসনের এরোমা দত্ত অংশ নেন।
