বাজিতপুরে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার পাঁচ দিন পার হলেও এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে নিহত তানিয়ার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, চার দিন আগে আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করার পর বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তেমন
কোনো প্রচেষ্টা নেই। তবে পুলিশ বলছে, এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান অব্যাহত আছে। এদিকে তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে গতকাল শুক্রবারও কিশোরগঞ্জ জেলা শহরসহ কয়েকটি উপজেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, নার্স, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন।
তানিয়া হত্যা মামলার বাদী তার বাবা গিয়াস উদ্দিন মামলার বাকি আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে হারালাম আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল, কিন্তু মামলা করার পর বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের কোনো চেষ্টা আমার চোখে পড়েনি। এজাহারভুক্ত আসামিরা তো কেউ অজ্ঞাত নয়? তাহলে পাঁচ দিনেও কেন আমার মেয়ের হত্যাকারী এখনো গ্রেপ্তার হচ্ছে না। পুলিশ মামলা রেকর্ড করার পর এই কয়েক দিনে আমাদের কাছে এসে কোনো খোঁজও নেয়নি। আমি প্রশাসনের কাছে জানতে চাই এর কারণটা কী?’
তানিয়ার ভাই সবুজ মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল আমার বোনকে হত্যা করেছে আসামিরা। কিন্তু মামলায় নাম উল্লেখ করার পরও কেন বাকি দুই আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না। আসামিদের ধরতে এমনকি আমাদের কাছে তারা কোনো সহযোগিতাও চাচ্ছে না।’
তানিয়ার চাচা নাসির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার এজাহারভুক্ত আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হচ্ছে না, এটা দুঃখজনক। এজাহারে আসামিদের নাম-পরিচয় থাকার পরও তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ব্যর্থ কেন তা সমাজ জানতে চায়।’
তানিয়ার এলাকা লোহাজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাহার উদ্দিন ভূঞা বলেন, ‘আমরা হত্যাকারীদের নাম-ঠিকানাসহ মামলা রেকর্ড করতে পুলিশকে সহযোগিতা করলাম। কিন্তু মামলার পর পুলিশ আর আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য জানতে চায়নি। এমন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের আরও তৎপর হওয়া উচিত ছিল।’
কিশোরগঞ্জ জেলা নার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের সহকর্মী ও বোন তানিয়াকে যারা ধর্ষণ ও হত্যা করেছে তাদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার আইনে বিচার করে ফাঁসি দিতে হবে।’
কিশোরগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি মায়া ভৌমিক বলেন, ‘আমরা সব খুনিকে এ সপ্তাহের মধ্যে গ্রেপ্তার দেখতে চাই। তা না হলে কঠোর আন্দোলনে নামব আমরা। পুলিশ কেন এখনো তাদের ধরতে তৎপর নয়। তাদের নীরব ভূমিকা নেওয়ার কারণ কী তা আমরা জানতে চাই।’
বাকি আসামিদের ধরতে না পারার কারণ জানতে চাইলে তানিয়া হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সারোয়ার জাহান বলেন, ‘আমরা বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান অব্যাহত রেখেছি। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে সব সময় খোঁজখবর নিচ্ছি। তানিয়া হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাকি আসামিদের ধরার জন্য আমাদেরকে সহযোগিতা এবং একটু সময় দিতে হবে।’
দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল কিশোরগঞ্জ
তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবারও উত্তাল ছিল পুরো কিশোরগঞ্জ জেলা। এদিন জেলা শহরে ও কয়েকটি উপজেলায় এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
এর মধ্যে সকাল ১০টার দিকে জেলা শহরের কালীবাড়ি এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ভোরের আলো সাহিত্য আসর, হোমিওপ্যাথিক ফোরাম ও আকুপ্রেসার গবেষণা সোসাইটি। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
একই দাবিতে ‘আমাদের কুলিয়ারচর’ ও ‘যুগান্তর স্বজন সমাবেশ’-এর আয়োজনে কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বেলা ১১টায় মানববন্ধন হয়। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে কটিয়াদী উপজেলায়। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে এই কর্মসূচিতে অংশ নেয় কটিয়াদী রক্তদান সমিতি, সচেতন নারী সমাজ, সেবিকা ঐক্য পরিষদ, রেনেসাঁ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কুমরী অগ্নিবীণা যুব সংঘ, উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টি, যুগান্তর স্বজন সমাবেশ, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উপজেলা ছাত্রলীগ, কটিয়াদী প্রবাহ, নাগরিক কমিটি, সবুজ বাংলা যুব সংঘ ও উপজেলা ছাত্রদল।
গত ৬ মে ঢাকার কল্যাণপুরে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া বাসে করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামের নিজ বাড়িতে আসছিলেন। পথে বাজিতপুরের জামতলী গজারিয়া এলাকায় তানিয়াকে স্বর্ণলতা নামে বাসটির চালক নূরুজ্জামান নূরু, তার সহকারী লালন মিয়াসহ কয়েকজন ধর্ষণ করে মাথায় আঘাত করে হত্যার পর ফেলে রেখে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় নূরুজ্জামান নূরু, লালন মিয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
