‘উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করলে হত্যার হুমকি দিত নয়ন’

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ০২:৫৮ এএম

বরগুনায় প্রকাশ্যে সড়কে বহু পথচারীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবক রিফাত শরীফকে। ওই হামলার সময় তার সঙ্গে থাকা স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নি হামলাকারীদের দুই হাত দিয়ে জাপটে ধরে এবং ধাক্কা দিয়ে বারবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। এ সময় তিনি আর্তচিৎকার করে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা বহু পথচারীর কাছে সাহায্য চাইলেও তা পাননি বলে জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বরগুনা পুলিশ লাইনস এলাকায় বাবার বাড়িতে বসে দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিন্নি।

রিফাতের ওপর হামলার ভয়াল স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিয়ের আগে থেকেই নয়ন আমাকে বিরক্ত করতে থাকে। তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে হবে, কথা না বললে মেরে ফেলবে, রাস্তাঘাটে আমার রিকশায় জোর করে উঠবে। এসব কথা কাউকে বললে মেরে ফেলবে বলে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে আসছিল। এরপর বিষয়টি পরিবারকে জানালে রিফাতের সঙ্গে আমার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের আগে থেকেই রিফাতের সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল।’

বিয়ের পর থেকেই রিফাতকে হত্যায় জড়িত থাকার অন্যতম অভিযুক্ত নয়ন বন্ড তাকে বিরক্ত করে আসছিল জানিয়ে মিন্নি বলেন, ‘বিষয়টি আমি আমার স্বামীকেও জানিয়েছিলাম। গতকাল (বুধবার) সকালে আমি রিফাতের সঙ্গে কলেজে গিয়েছিলাম। পরে রিফাত আমাকে কলেজ থেকে আনতে যায়। আমরা কলেজ থেকে বের হওয়ামাত্রই কলেজের গেটে ওঁৎ পেতে থাকা কিছু সন্ত্রাসী রিফাতকে কলেজ গেট থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে নয়ন বন্ড ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কাছে নিয়ে যায়। তখন তাদের মধ্য থেকে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজি রাম দা নিয়ে আমার স্বামীকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। আমি অনেক চেষ্টা করেও ফেরাতে পারিনি। অস্ত্র ধরছি, তাদের ধরছি, চিৎকার করছি। কেউ আগায়া আসে নাই। কেউ আমারে একটু হেল্প করে নাই। আমি একলা হাসপাতালে নিয়া গেছি।

রিফাতকে যখন রাম দা দিয়ে কোপানো হচ্ছিল, তখন আশপাশে হামলাকারীদের বেশ কয়েকজন সহযোগী দাঁড়িয়ে ছিল জানিয়ে মিন্নি বলেন, ‘ওই ছেলেগুলোই প্রথমে রিফাতকে মারধর করেছিল।’

দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির রায় কার্যকরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন মিন্নি। তিনি বলেন, ‘আমি চাই নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজি ও রিশান ফরাজির দ্রুত ফাঁসি হোক।’

গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা শহরের কলেজ রোডে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামের দুলাল শরীফের ছেলে রিফাত শরীফকে (২৩) স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। রিফাতকে প্রথমে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল চারটার দিকে রিফাতের মৃত্যু হয়।

বুধবার দুপুরের ওই হামলার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক চড়াও হয়েছে রিফাতের ওপর, এর মধ্যে দুজন রাম দা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর রিফাতকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন তার স্ত্রী। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েও তিনি ব্যর্থ হন। রিফাতের স্ত্রীর চিৎকারে আশপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি। হামলাকারী যুবকরা রিফাতকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে সবার সামনে দিয়েই হেঁটে চলে যায়।

ওই হামলার জন্য বরগুনা পৌরসভার ক্রোক এলাকার নয়ন বন্ড নামে এক যুবককে দায়ী করেছেন রিফাতের স্ত্রী মিন্নি। এ ছাড়া রিফাত ফরাজি ও রিশান ফরাজি নামে আরও দুজনের কথাও বলেছেন তিনি।

এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রিফাতের বাবা বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করার পর তাদের মধ্যে চন্দন নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত