নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে সোচ্চার হতে হবে

আপডেট : ২৯ জুন ২০১৯, ১০:২৮ পিএম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মতামত প্রকাশের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কেবল মতপ্রকাশই নয়, সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার নানারকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কোনো বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক, পক্ষ-বিপক্ষের কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে শুরু করে মতাদর্শিক লড়াই ও প্রপাগান্ডার অন্যতম হাতিয়ারও হয়ে উঠেছে অনলাইন প্লাটফর্মগুলো। চাঞ্চল্যকর খুন বা ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর অনলাইন পরিসরে ওই ঘটনার নানারকম ব্যবচ্ছেদ আর তা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিতর্ক যুক্তি বা নীতি-নৈতিকতার সীমা না মেনে একচোখা ও প্রবলভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে।

অনেক ক্ষেত্রেই অনলাইন সামাজিক পরিসরে এমন আক্রমণের প্রধান শিকারে পরিণত হন নারীরা। বিষয়টি সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনায় অপরাধী বা অপরাধীদের বাদ দিয়ে বা আড়াল করে যখন অপরাধের শিকার নারী বা ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নারীর চরিত্র হনন শুরু হয়। আর শেষ পর্যন্ত বিষয়টি গড়াতে থাকেÑ সার্বিকভাবে নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা, নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো, নির্যাতিতকেই দায়ী করা পর্যন্ত। নানারকম পোস্ট এবং কমেন্টের মধ্য দিয়ে এই সব কিছুই ঘটে থাকে নারীর স্বাধীন মতপ্রকাশ ও চলাফেরার বিরোধিতা করে। অনলাইন সামাজিক পরিসরের এই বাস্তবতা সমাজবিচ্ছিন্ন নয় মোটেই; বরং তা সমাজমানসেরই প্রতিফলন। অনলাইন পরিসরে ব্যক্তি খানিকটা আড়ালে থাকে বলে এসব নেতিবাচক মনোবৃত্তি সেখানে আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে এবং এর প্রকট রূপটিও সেখানে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।

‘ভিকটিম ব্লেইমিং’ বা অপরাধীকে আড়াল করতে ‘অপরাধের শিকারকে’ দোষারোপ করা সমাজে নতুন কিছু নয়। বিগত বছরগুলোতে দেশের আলোচিত নানা যৌন নিপীড়ন-ধর্ষণ এমনকি হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনাতেও এর কদর্য রূপটি দেখা গেছে। বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রথমে যেমন রুনির বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ আনা হয়; তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুনিকে নিয়ে নানা আপত্তিকর পোস্টের পাশাপাশি এমনকি সংবাদ মাধ্যমেও নানারকম শিরোনাম দেখা গেছে। শুধু সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডই নংÑ সম্প্রতি খাদিজা, নুসরাত, মিতু ও তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাতেও এই একই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কখনো নিজে খুন হওয়ার ঘটনায়, কখনো স্বামীর খুন হওয়ার পেছনে, ওই নারী বা স্ত্রীকে পরকীয়ার অপবাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আসামিপক্ষের লোকজন ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের নানা তথ্য ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবাপন্নরা সেটি লুফেও নেন। এমনকি এ ধরনের কথা বলতে ছাড়েননি মন্ত্রী, সাংসদরাও। অথচ গত সাত বছরে আলোচিত এমন চারটি খুনের ঘটনার কোনোটিতেই নারীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

সর্বশেষ গত বুধবার বরগুনায় স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় স্বামী রিফাত শরীফকে। কুপিয়ে মারার সে দৃশ্যের ভিডিও তোলপাড় তোলে সারা দেশে। কিন্তু এবারও দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে আয়েশার ওপরই। প্রধান তিন খুনির একজনের সঙ্গে আয়েশার প্রেমকে কারণ দেখিয়ে নানা অপপ্রচার চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রচার করা হচ্ছে ওই খুনির সঙ্গে বিয়ের কাগজপত্র, এমনকি অন্তরঙ্গ ছবিও। এতে প্রকাশ্য খুনের মতো গুরুতর অপরাধের চেয়ে মুখরোচক আলোচনাই গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব আলোচনার ফাঁক গলে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এভাবে অপরাধ এবং অপরাধীকে আড়াল করতে আঘাত করা হয় নারীর স্বাধীন চলাফেরা এবং পোশাক-পরিচ্ছদকেও। প্রায়ই বলতে শোনা যায়, অশালীন বা আপত্তিকর পোশাকের কারণেই নারীরা উত্ত্যক্ত এমনকি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে দেখা গেছে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার অনেক নারীই নিয়মিত হিজাব ব্যবহার করতেন। শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে কি আপত্তিকর বা অশালীন পোশাকের এমন খোঁড়া যুক্তি ধোপে টেকে? কোনোভাবেই টেকে না।

এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। সেটা সমাজে নারীর অবস্থান ও ক্ষমতার প্রশ্ন, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রশ্ন। দেশে যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা যে হারে বাড়ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, গত পাঁচ বছরে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার নারীর সংখ্যা প্রায় চার হাজার। কেবল ২০১৮ সালেই ধর্ষণ হয়েছে ৭৩২টি, এরমধ্যে ৬৬ জনকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিত ও ধর্ষণের পর হত্যার শিকারদের একটা বড় অংশই কিশোরী ও শিশু। এই অসুস্থ সমাজের রোগ সারিয়ে তুলতে না পারলে, যৌন নিপীড়ন-ধর্ষণ বন্ধ করতে না পারলে, এই সমাজে মানবিকতা প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হবে না। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতদের অবশ্যই কর্তব্যনিষ্ঠ হতে হবে। বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত