চাকরি স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি ও সরাসরি নিয়োগ বন্ধের দাবিতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের উপজেলা পর্যায়ের কর্মীরা ব্যাংকটির শাখা বন্ধ রেখে আন্দোলনে নেমেছেন। অনেক উপজেলা থেকে কর্মীরা ঢাকায় এসে ইস্কাটনে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে দেশের ১৬৬ উপজেলায় এ ব্যাংকটির শাখা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গত ৮ জুলাই ১৬৬ উপজেলায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখা খোলাই হয়নি। এতে ব্যাংকের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ব্যাংকটির এমডি আকবর
হোসেন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্মীদের আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তারা পদোন্নতির দাবি করছে। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা হচ্ছে। নীতিমালা চূড়ান্ত করে খুব শিগগিরই পদোন্নতি দেওয়া হবে। কর্মীদের এ তথ্য আমরা জানিয়েছি। তারপরও কেউ কাজে না ফিরলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘বিদ্যমান এ ব্যবস্থা চলতে দেওয়া সমীচীন হবে না’ উল্লেখ করে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন গত মঙ্গলবার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বলেছেন, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মচারীদের মধ্যে কেউ অফিসে অনুপস্থিত থাকলে তার নাম ও পদবি জরুরি ভিত্তিতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পাঠাতে। চিঠির অনুলিপি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম ও দেশের সব জেলা প্রশাসককে পাঠানো হয়েছে। এ চিঠির একটি কপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে।
ওই চিঠিতে এমডি লিখেছেন, ‘আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মচারীদের একটি অংশ গত ৬ জুলাই থেকে ঢাকায় অবস্থান করে চাকরি স্থায়ীকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে মানববন্ধন করছে। চাকরির সুযোগ-সুবিধার দাবিতে বৈধ দাপ্তরিক পদ্ধতি অনুসরণ না করে হঠাৎ এ ধরনের আন্দোলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ফলে অফিস শৃঙ্খলা বিঘিœত হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত ৮ জুলাই সারা দেশে ১৬৬ উপজেলায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখা খোলা হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক সেবাগ্রহীতা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই বিদ্যমান এ ব্যবস্থা চলতে দেওয়া সমীচীন হবে না।’
গতকালও রাজধানীর ইস্কাটন রোডে প্রবাসী কল্যাণ ভবনে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন সারা দেশ থেকে আসা কর্মীরা। এ সময় মাইক ব্যবহার করে বিভিন্নজনকে বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। তারা পদোন্নতি ছাড়াও ব্যাংকটিতে সিনিয়র অফিসার পদে সরাসরি জনবল নিয়োগের বিরোধিতা করছিলেন।
কর্মীদের শান্ত করে কাজে ফেরত যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে গত ৮ জুলাই বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের এমডি স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের উপজেলা পর্যায়ের কর্মচারীদের একটি অংশ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে সরাসরি নিয়োগ বন্ধের দাবিতে গত ৬ জুলাই রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সাংবাদিক সম্মেলন করে। পরদিন ইস্কাটনের প্রকল্প ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেন, যা সম্পূর্ণ অফিস শৃঙ্খলা পরিপন্থি। কর্মচারীদের বৈধ দাবি পেশ করার দাপ্তরিক পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ এ ধরনের আন্দোলন কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এতে আরও বলা হয়েছে, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের উপজেলা পর্যায়ের ৫৩৬৮ জন কর্মচারীর মধ্যে ৪৭৫৬ জন কর্মচারীকে ইতিমধ্যে ব্যাংকের বিভিন্ন সমমানের পদে ২০১৮ সালের ১ আগস্ট থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ২০১৯ সালের ১ জুলাই তাদের একটি ইনক্রিমেন্ট মঞ্জুর করা হয়েছে। তাদের পদোন্নতির জন্য একটি পদোন্নতি নীতিমালা সরকারের অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। নীতিমালাটি অনুমোদিত হলেই পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হবে। যেসব কর্মচারী এখনো স্থানান্তর হতে পারেনি, তাদের নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন সাপেক্ষে পরে স্থানান্তর করা হবে। আগে-পিছে স্থানান্তরের কারণে কেউ চাকরিকাল গণনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
সরাসরি লোক নিয়োগ দেওয়া প্রসঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরাসরি সিনিয়র অফিসার নিয়োগের কারণেও কারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই। তাই কর্মচারীদের বিদ্যমান একাংশের চলমান আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রকল্প ও ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ কর্মচারীদের দাবি সম্পর্কে অবগত আছে। পর্যায়ক্রমে সব দাবি পূরণ হবে।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও যারা কাজে ফিরবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, ‘এ নোটিস জারির পরও যেসব কর্মচারী অফিসে অনুপস্থিত থাকবেন, তাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কর্র্তৃপক্ষ প্রত্যাশা করে যে, সব আন্দোলনরত কর্মচারী অবিলম্বে অফিসের কাজে যোগদান করবেন।’
১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প চালু করে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আবার চালু হয় এ প্রকল্প। প্রকল্পটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০১৪ সালে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন করার পর ওই বছরের ৮ জুলাই গেজেটের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করে সরকার। ওই আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়, ২০১৬ সালের ৩০ জুনের পর ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বিলুপ্ত হবে। বিলুপ্ত প্রকল্পের সব সম্পদ, ক্ষমতা, কর্র্তৃত্ব, অর্থ, কর্মসূচি এবং দায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একযোগে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০ শাখার উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বিশেষায়িত এ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে ব্যাংক চালুর পর প্রকল্পটি বিলুপ্ত হয়নি। ব্যাংকের পাশাপাশি প্রকল্পটিও চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রকল্পটি এখন ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর তিন বছর পার হলেও আমানত সংগ্রহ বা ঋণদানের কাজ শুরু হয়নি। ব্যাংকের সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে পরিশোধিত মূলধনের পুরো অর্থ সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি। প্রকল্প ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ এ উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
