দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি পেয়েছেন সচ্ছলরা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০১:৫২ এএম

ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মাণ করা ভবন বরাদ্দ নিয়েছেন ধনী ও সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা। মাসে ৮৩ হাজার টাকার বেশি আয় করেন এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধাও ৫০০ বর্গফুট আয়তনের ছাদওয়ালা পাকা ঘর নিয়েছেন নিজেদের অসচ্ছল ও ভূমিহীন দেখিয়ে। ভবন পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি চাকরিজীবীরাও। অথচ রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকায় ‘বীর নিবাস’ নামের এসব ভবন পাচ্ছেন না প্রকৃত অর্থে ভূমিহীন ও অসচ্ছল অনেক মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের ভবন বরাদ্দেই কেবল অনিয়ম হয়নি, ভবনগুলো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের পণ্য ও উপকরণ।

‘ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প’-এর আওতায় ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৪৮৪টি উপজেলায় ২ হাজার ৯৬২টি আবাসন ভবন নির্মাণ করা হয়। টয়লেট ও পানীয় জলের সুবিধাসহ তিন কক্ষবিশিষ্ট ৫০০ বর্গফুট আয়তনের এসব ভবনে রয়েছে একটি করে বারান্দা। জাতীয় পতাকার আদলে রং করা বীর নিবাসের প্রতিটিতে রয়েছে দুটি বেডরুম, একটি ড্রয়িংরুম, একটি বারান্দা। এর বাইরে একটি করে টিউবওয়েল, টয়লেট, গবাদিপশু ও পোলট্রি শেড নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১০টি উপজেলায় ৩০০টি ভবন বরাদ্দ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর জরিপ করে প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাতে দেখা গেছে, ৩০০ ভবনের মধ্যে ৩৫টি ভবন বরাদ্দ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকারও বেশি। এর মধ্যে তিনটি ভবন বরাদ্দ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে আয় ৯ লাখ থেকে ১০ লাখের ঘরে। চারটি ভবন বরাদ্দ পেয়েছেন, যাদের বছরে আয় ৮ লাখ থেকে ৯ লাখের

মধ্যে। ৭ লাখ থেকে ৮ লাখের মধ্যে আয় এমন মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছেন পাঁচটি ভবন, বছরে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছেন ৯টি, ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা আয়ধারী মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছেন ১৪টি, ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা আয়ের মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছেন ১৬টি ভবন। বাকিদের আয় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যক্তি নির্বাচনে স্থানীয়ভাবে কমিটি করা হয়েছে, এখানে মন্ত্রণালয়ের কোনো হাত নেই। তবে আমি যাদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি, সেসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছি। বরাদ্দে অনিয়মের কারণে ২২ জনের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এরপর কোনো সচ্ছল ব্যক্তি ‘বীর নিবাস’ পেয়ে থাকলে সেটা খুবই দুঃখজনক। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সতর্ক থাকব। আইএমইডির প্রতিবেদনে যেসব অনিয়মের কথা উঠে এসেছে, তা তদন্ত করে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের ৪৮৪ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৭১ কোটি টাকা। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও লেগেছে সাড়ে ৬ বছর।

 

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় কিছু কিছু উপজেলায় রাজনৈতিক প্রভাবে বীর নিবাস বণ্টনে অনিয়ম হয়েছে। তুলনামূলক কম যোগ্যরা বরাদ্দ পেয়েছেন, বেশি যোগ্যরা বঞ্চিত হয়েছেন। প্রকল্পের তদারকি ভালো থাকার পরও কিছু কিছু কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া কিছু কিছু বীর নিবাস কাঁচা ভিতের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে, বিল্ডিংয়ের কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদার চলে গেছেন, যা ঠিক হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও মুখপাত্র মতিয়ার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে প্রকৃত অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচনে নির্দেশনা দেওয়া ছিল। এ জন্য কমিটিও করে দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে নতুন করে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে যেন এমনটি না হয়, তার জন্য সতর্ক থাকবে মন্ত্রণালয়।

প্রতিবেদনে ‘বীর নিবাস’প্রাপ্ত ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার ওপর একটি জরিপ করা হয়েছে। এই জরিপে উঠে এসেছে, প্রকল্প বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অনিয়মের চিত্র। জরিপে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দুজন পেশায় ডাক্তার, ১৭ জন শিক্ষক, ৫০ জন সরকারি চাকরিজীবী, ১০ জন বেসরকারি চাকরিজীবী, ৬ জন ব্যবসায়ী ও ২১০ কৃষক রয়েছেন।

অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোলাগঞ্জের কোটালীপাড়ার রামশীলা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেন্দ্রনাথ তালুকদার বলেছেন, তার নিবাসটিতে খুবই নিম্নমানের ইট, বালি ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনের কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদার চলে গেছেন, শীতকালে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু নিজে কাজ করিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত