এরশাদের মৃত্যু ও তার উত্তরাধিকার

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ১২:০২ এএম

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে গতকাল সকাল পৌনে ৮টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তিনি গত ১০ দিন ধরে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর মাধ্যমে নয় দশকের দীর্ঘ জীবনের অবসান হয়েছে। প্রবল ক্ষমতাবান সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রায় এক দশক তার পদচারণা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল এরশাদ তার রাজনৈতিক বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন যার জের চলছে আজও। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন দেশের বিরোধীদলীয় নেতা। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের পাশাপাশি শোক প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে যদি জনমতের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয় তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে দেশের সাধারণ মানুষও তার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত।  জেনারেল এরশাদ দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তার স্বাস্থ্যের প্রতিদিনের হালনাগাদ খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। শেষ লগ্নে এসে দেখা গেল, মানুষ তার প্রতি কিছুটা হলেও সহমর্মী। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারি করে যে প্রতাপের সূচনা করেছিলেন এরশাদ ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর সেই শক্তিকেই মানুষ কার্যত তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর বেশ কয়েক বছর জেলেও কাটাতে হয়েছে এককালের এই সামরিক একনায়ককে। ক্ষমতা হারানোর পরপরই সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জেলে থেকেও পাঁচ পাঁচটি আসনে জয়লাভ করে সাবেক এই সেনাশাসক তার রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার সেই পুঁজিই হয়ে ওঠে ক্ষমতার পালাবদলের নিয়ামক। এরশাদকে হটিয়েছিল যেই দুই দল তারাই তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে ভোটের অংকের লড়াইয়ে জিততে চেয়েছিল। তাতে করে এরশাদের রাজনৈতিক বৈধতা পোক্ত হয় এবং একনায়কবিরোধী জনচেতনা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসে।

ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ যেমন তার পূর্বসূরির দেখানো পথ ধরে রাজনীতি বিনষ্টের সকল আয়োজন করেছেন ক্ষমতা ত্যাগের পর বাংলাদেশ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল তার ধারাবাহিকতা। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকালে রাজনীতি ও আইনের শাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের যে সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছিল দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো তা উপেক্ষা করেছে। এরশাদ পতনের ২৮ বছর পরও সেই প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে। অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রতীক এরশাদ ও তার উত্তরাধিকার ছায়ার মতো সঙ্গী হয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে।  এরশাদ তাই প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি তো বটেই বরং জোরদার হয়েছে জনমানসে।  দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে এরশাদীয় ধারার রাজনীতির ছায়া থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। আইনের শাসন, সুশাসন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, কার্যকর সংসদীয় রাজনীতি তথা জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। 

 

১৯৯১ সালে পাওয়া সুযোগ ধারাবাহিকভাবে অবজ্ঞার পরিণতি কী তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশ যেমনভাবে বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য আলোচিত হচ্ছে তেমনভাবে আলোচিত হোক তার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্যও।  মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেই জাতির জন্ম, ভাষা-সংস্কৃতির জন্য যেই জাতির দৃষ্টান্তমূলক সংগ্রাম আছে, মাত্র ২১ বছরের ব্যবধানে যাদের আছে দুইজন সামরিক শাসককে উৎখাত করার সমৃদ্ধ ইতিহাস তারা একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্রেরও দাবিদার।  

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত