মামলা গুরুত্বহীন করতেই মিন্নিকে দোষারোপ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৯, ০৩:১৮ এএম

বরগুনার আলোচিত শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ) হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বাঁচাতে নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে ফাঁসানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি মহল। ‘থলের বেড়াল’ বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কায় হত্যাকারীদের প্রশ্রয়দাতা মহলটি রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফকে মিন্নির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে করিয়েছে মানববন্ধন। নতুন একটি ভিডিওর সূত্র ধরে প্রভাবশালী মহলের এই চেষ্টা সফল হলে মামলাটি গুরুত্ব হারাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একটি সিসিটিভি ফুটেজের পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ জুলাই ‘হত্যায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতা’ রয়েছে বলে দাবি করেন রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ। সংবাদ সম্মেলন করে তিনি মিন্নিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ারও দাবি জানান। এর পরদিনই ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন হয় শহরে। কথিত সর্বস্তরের জনগণের সেই মানববন্ধনে সুশীল সমাজের কোনো প্রতিনিধি না থাকলেও ছিলেন বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মারুফ মৃধা। রাখা হয় রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ও চাচা আবদুল আজিজ শরীফকেও। অভিযোগ রয়েছে সুনাম দেবনাথের অর্থায়নে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেন মঞ্জুরুল আলম জন নামের এক ব্যক্তি।

অথচ এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ জড়িত সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে আলোচনায় নাম আসে বরগুনা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ এবং সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের নাম। তখন শম্ভু গ্রুপ ও দেলোয়ার গ্রুপ পরস্পরকে দোষী করে বক্তব্যও দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শম্ভু গ্রুপ দাবি করে, রিফাত ও রিশান ফরাজী দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। তার ছত্রছায়ায়ই এরা বেড়ে উঠেছিল। সুনাম দেবনাথ বলেন, দেলোয়ার গ্রুপ আর শম্ভু গ্রুপের দ্বন্দ্ব দীর্ঘ দিনের। এ জন্য দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলেদের প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন দাবি করেন, নয়ন বন্ড এমপি-পুত্র সুনাম দেবনাথের শিষ্য। সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, তারা (রিফাত ও রিশান ফরাজী) আমার রক্তের সম্পর্কে কিছু হয় না। বৈবাহিক সূত্রের আত্মীয়। তাদের কখনো প্রশ্রয় দিইনি। সে সময় তিনি রিফাত ও রিশান ফরাজীসহ হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেন।

কিন্তু নতুন ওই ভিডিও ফুটেজ আসার পরেই ক্ষমতাসীন দলের এই নেতারা সুর পাল্টে ফেলেছেন। নিয়েছেন প্রধান সাক্ষীকে গ্রেপ্তার করানোর মাধ্যমে মামলাকে গুরুত্বহীন করার নতুন কৌশল।

বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল বারী আসলাম বলেন, মেয়েটির আকুতির কারণে মামলাটি জোরালো হয়েছে। তাকে আসামি করা হলে মামলা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।

এদিকে ১৪ তারিখের মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সুনাম দেবনাথ বলেন, মিন্নির ওপর দায় চাপাতে আমি অংশ নিইনি। রিফাত শরীফের বাবার অনুরোধে হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছি। মানববন্ধনে অর্থায়নের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান মারুফ মৃধা বলেন, আমি রিফাত হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছিলাম। মানববন্ধনে আমার বক্তব্যে বলেছি, মিন্নি যদি জড়িত থাকে, তবে ওকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, তবে গ্রেপ্তারের দাবি জানাইনি।

বিষয়টি নিয়ে মিন্নি বলেন, খুনিদের আড়াল করতেই আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা বানোয়াট তথ্য ছড়ানো হয়েছে। মনে হয় আমার শ্বশুরকেও কেউ ভুল বুঝিয়ে এসব করাচ্ছে। এই মামলার সূত্র ধরে অন্য কোনো বিষয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ০০৭ গ্রুপের আশ্রয়দাতারা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

তবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের বিষয়ে দুলাল শরীফ বলেন, আমার মনে হয়েছে আমার ছেলে হত্যায় মিন্নিও জড়িত থাকতে পারে। তাই আমি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছি। কোনো চাপে পড়ে মানববন্ধন কিংবা সংবাদ সম্মেলন করিনি।

এদিকে মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন করার ফলে অনেক কিছুই চাপা পড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা। একই সঙ্গে মামলার তাৎপর্যও কমে যাবে বলে ধারণা তাদের। বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান নান্টু বলেন, সাক্ষীকে আসামি করা হলে মামলাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী রেখে প্রসিকিউশন তৈরি হয়ে থাকলে সেখান থেকে হঠাৎ ফিরিয়ে আনা হলে তখন বিষয়টি জটিল হয়ে যাবে। মামলা বিচারে উঠলে অনেকেই সন্ত্রাসীদের ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চাইবে না। তখন মিন্নি আসামি থাকলে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। কারণ মিন্নি শুধু এই মামলার সাক্ষীই নন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত