গণতন্ত্রের ভাষা আর গণতান্ত্রিক আচরণের প্রত্যাশা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ১০:৪৯ পিএম

রবীন্দ্রনাথ তার প্রবন্ধ পুস্তিকা ‘সমূহে’র এক জায়গায় বলেছিলেন, তিক্ত বড়িকে মিষ্টি আকারে গেলানো রাজনীতির নৈপুণ্য। রবীন্দ্রনাথ বোধকরি সুস্থ রাজনীতির ভুবনে বসে অমন মূল্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু নষ্ট রাজনীতির এ সময়ে বাস্তবতা হচ্ছে মিষ্ট জিনিসকেও পারলে তিক্ত করে পরিবেশন করা। এর মধ্যেই সম্ভবত রাজনীতিকরা বাহাদুরি খুঁজে পান। বিপক্ষ কেউ ইট মারলে কুশলী বাক্যবাণে ধরাশায়ী না করে প্রতিপক্ষ খুঁজতে থাকেন আরও স্থূলকায় পাটকেল। তাই মেধাবী রাজনীতির আকাল যেমন দিনে দিনে দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি শানিত মেধার শব্দচয়নও নির্বাসিত হচ্ছে। শব্দচয়ন কখনো কখনো শ্রুতিগ্রাহ্য হলেও আচরণ অনেক ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হয় না। সুনীতি-দুর্নীতির প্রসঙ্গ না হয় নাই-বা টানলাম। এমন ধারা গণতান্ত্রিক আচরণের পথ যেমন বন্ধুর করে দেয়, তেমনি গণতন্ত্রের যে একটি পরিশীলিত ভাষা ও আচরণ আছে, একে করে দেয় অচেনা।

এসব মন্তব্যের সপক্ষে উদাহরণের অভাব হবে না। রাজনীতির নায়ক-মহানায়করা যাদের সাধারণত মূর্খ ভাবেন, সে-ই এ দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এ ধরনের উদাহরণ দেখে ও শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আমাদের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না ভেবে কেন জানি দুশমন ভাবতেই পছন্দ করে বেশি। তাই দুশমনির পরিবেশে গণতান্ত্রিক ভাষা ও আচরণ তো লাঞ্ছিত হবেই। রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবিধান সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় থাকাটা হচ্ছে সামরিকতন্ত্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের একটি বড় দৃশ্যমান পার্থক্য। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় সংবিধান কার্যকর থাকে। এর অর্থ জাতীয় সংসদ কার্যকর থাকা। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা মুখরিত করে রাখবেন সংসদ অধিবেশনÑ এটিই কাম্য। সাধারণ মানুষ তাদের চাওয়া-পাওয়ার পূর্ণতা খুঁজবেন এখানেই। কিছুকাল আগে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসনকালে রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল সদস্য সংখ্যায় বিরোধী দল সবল অবস্থানে না থাকলে প্রথম কর্তব্য হবে সরকারকে অকার্যকর করে তোলা। পাঁচ বছর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে ক্ষমতার পালাবদলের অনিশ্চয়তায় অপেক্ষা করার ধৈর্য আমাদের বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের থাকে না। তারা মনে করেন, সংসদে উপস্থিত থাকলেই বুঝি নিয়মে বাধা পড়ে যাবেন। তাতে সরকার পক্ষের পায়ের নিচের মাটি শক্ত হবে। তাই বিরোধী দলের লাগাতার সংসদ বর্জন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। এর জন্য ছুতানাতা কারণও বের করতেই হয়। সে সময় দেশবাসী লক্ষ করেছে, বর্জন প্রক্রিয়া শুরু হতো নানা উছিলায়। যেমনÑ কখনো সামনের সারিতে অতিরিক্ত আসন পাওয়ার বালখিল্য আচরণ দিয়ে। আর শেষ হতো সংসদে কথা বলার পরিবেশ নেই এই জিগির তুলে। দুই পক্ষের লাগালাগিটাই প্রধান ছিল, জনগণের অধিকার নিয়ে ভাবার অবকাশ হতো না তেমন। এভাবে লঙ্ঘিত হতো গণতান্ত্রিক আচরণ। মহাজোট নির্বাচনে মহাবিজয় অর্জন করার পর দেখা গিয়েছিল সংসদ মহাজোটের এমপিদের আড্ডাস্থল হয়েছিল আর বিরোধী দলের অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের এমপি ও নেতাকর্মীদের দায়িত্ব ছিল রাজপথ এবং প্রেসের সামনে সরকারি সমালোচনার খই ফোটানো। সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে এভাবে অগণতান্ত্রিক আচরণ দেখা মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। এখন তো বিএনপি দুর্বল হওয়ায় সংসদে তেমন উত্তাপ নেই। সংসদে প্রধান বিরোধী দল সরকারেরই সহযোগী। এ কারণে সংসদ অনেকটাই নিরুত্তাপ। সংসদে গণতান্ত্রিক আচরণের তেমন অবকাশ নেই বলে এখন জনগণের আলোচনার প্রধান বিষয় আর সংসদ নয়। কবরের শান্তিও এক রকম শান্তি। তেমন শান্তি বিরাজ করছে এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে। এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের স্বার্থ লঙ্ঘিত হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোটে পাস হয়ে যায় বাজেটের সব অধ্যায়। আমরা মনে করি সংসদ কোনো পক্ষেরই মৌরুসীপাট্টা নয়। এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। এখানে জনগণের জন্য কথা বলা আর আইনপ্রণয়ন করতে মানুষ ভোট দিয়ে পাঠায় এমপিদের। সব পক্ষ যার যার অধিকারের শক্তিতে এখানে এসে দায়িত্ব পালন করবেন। তাই সংসদে গণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশিত থাকে। তবু ভালো গত দুই সংসদে বিএনপি প্রায় অনুপস্থিত এবং দুর্বল অবস্থানে থাকায় আমাদের দুই পক্ষের নেতানেত্রীদের কাছ থেকে অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগ দেখতে ও শুনতে হচ্ছে না।

গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকবেই। উভয় পক্ষের মধ্যে সমালোচনা প্রতি সমালোচনা থাকবে। মেধাবী বিতার্কিকের শানিত শব্দে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েল করবে। এতে আক্রান্তের অন্তর বিদীর্ণ হবে কিন্তু সাধারণ মানুষ বিব্রত হবে না। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোর মধ্যে হাজার বিরোধিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটি অটুট থাকবে। যেকোনো সভ্য দেশের রাজনীতিকরা এই ভদ্রতাটিকে লালন করেন। আমাদের দেশে সক্রিয় প্রতিপক্ষ থাকলেও এ পরিবেশ নির্বাসিত হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা একসময় একটি জনপ্রিয় বিষয় ছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিটিভির বিতর্ক প্রতিযোগিতা দর্শকদের কাছে ছিল বেশ আকর্ষণীয়। নানা বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা হতো সে সময়। প্রায় এক দশক ধরে বিতর্ক প্রতিযোগিতার ধারা পাল্টে গেছে। এখন সবাই সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক করে। এতে পুরোটাই হয়ে পড়েছে ছকবন্দি। বিতর্ক প্রতিযোগী কিশোর তরুণরা ছায়া সংসদের আসর বসায়। সরকারি দল ও বিরোধী দল বানিয়ে মুখোমুখি বসে। মাননীয় স্পিকার বলে মুখে খই ফোটায়। মাঝে মাঝেই প্রতিপক্ষের বক্তাকে থামিয়ে দিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলে। সংসদীয় রীতিতে যা হয় আর কি! এতে সংসদীয় ঝগড়া দেখে দর্শকের কিছুটা বিনোদন হলেও বিতর্ক থেকে পাওয়া মেধাচর্চা আর পরিশীলিত কণ্ঠশীলন অনেকটা কমে যাচ্ছে। তারপরও আমি অবাক হয়ে ওদের দেখি আর ভাবি যার যেখানে অভাব তারা সে চর্চাই বেশি করতে চায়। সংসদের চার দেয়ালের ভেতরের শূন্যতা এরা হয়তো এভাবেই চায় পূরণ করতে। এ দেশের সাংসদদের বলনে আচরণে অস্বস্তি আছে বলেই বুঝি সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আমাদের বিতার্কিকরা সংসদীয় বিতর্কের আসর বসায়। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে এদের অধিকাংশের হয়তো কোনো দিন সংসদে গিয়ে কথা বলার সুযোগ হবে না। ছাত্র জীবনের এই প্রশিক্ষণের অধিকাংশই হয়তো কাজে লাগবে না। তবুও ওদের কথা বলার মার্জিত ধরন আর মেধাবী শব্দ-প্রয়োগ কৌশল যদি মাননীয় সাংসদদের কিছুটা প্রভাবিত করে, তেমন শুভ আশা হয়তো এ ধরনের বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজকদের মধ্যে কাজ করে থাকতে পারে।

আমাদের ধারণা, অতি বেশি দলীয়করণ মানসিকতা রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের গণতান্ত্রিক বোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তারা হয়ে পড়ছেন অনেক বেশি উদ্ধত। মাঠের রাজনীতি করে এলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মোসাহেবদের বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েন। এ কারণে গণতন্ত্র শুধু বক্তৃতার ভাষা হিসেবে টিকে থাকে। আর প্রায়োগিক ক্ষেত্রে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। তাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলের ভেতরে গণতন্ত্র অনেকটাই নির্বাসিত। এ জন্য দল দুটোর কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে। দল পরিচালনায় ধারাবাহিকতার কোনো ধাপ নেই। ফলে আশঙ্কা হয় সুপ্রিম নেত্রীদের অবর্তমানে দলগুলোর পুনর্বিন্যাস কতটা কঠিন হয়ে পড়বে। আচরণ ও বিশ্বাসে গণতান্ত্রিক না হতে পারলে দল হিসেবে বিএনপির সংকট অনেক বেশি। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তারেক জিয়া যে দলের হাল ধরবেন, বর্তমান বাস্তবতায় তা অনিশ্চিত। খালেদা জিয়া জেলে আর তারেক জিয়া নির্বাসনে। এতেই দলের যে ছন্নছাড়া দশা, তাতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএনপির বড় সংকট হচ্ছে এটি এ দেশের মাটিতে দীর্ঘমূল প্রথিত দল নয়। নানা ঘাটের সুবিধাভোগীদের ক্লাব মাত্র। অমন পরিস্থিতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট হওয়ার কথা। জামায়াত বন্ধুত্ব বিএনপিকে ঘুণপোকার মতো কেটেছে এত দিন। ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে জামায়াত সান্নিধ্য ত্যাগ করার কল্পনা করতে পারেনি বিএনপি। আওয়ামী লীগ অতিমাত্রায় সভানেত্রী নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দল পরিচালনায় সিঁড়ির ধাপ তেমনভাবে তৈরি হয়নি। ফলে খোদা না করুন কখনো দুর্দিন এগিয়ে এলে একে সামাল দেওয়া এ দলের জন্যও সহজ হবে না। কিন্তু এ সত্যও তো অস্বীকার করা যাবে না বিএনপি আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভেতরেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য জড়িয়ে আছে। এই দুটি দলই দুর্বল হয়ে যাক তা আমরা কামনা করি না। যদি প্রকৃতির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অজানা কোনো প্রকৃত জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক তৃতীয় পক্ষের আগমন না ঘটে, তবে এই দুই দলের সাফল্যের মধ্যেই এ দেশবাসীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কিন্তু বর্তমান দুর্বল দশার বিএনপিকে দেখে প্রত্যাশার আলো অনেকটাই নির্বাপিত হচ্ছে। তারপরও আমরা আশা করব, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হেঁটে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। পরিশীলনের মাধ্যমে এই দুই দলের নেতানেত্রীরা গণতন্ত্রের প্রকৃত পূজারি হবেন।

অবশ্য আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক শাসনকালে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছে। জরাগ্রস্ত রাজনৈতিক পরিবেশে দেশের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন আশা তৈরি করেছে মানুষের মধ্যে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি এতকাল এতটা দৃশ্যমান ছিল যে, দেশবাসীর শুভ প্রত্যাশার জায়গাটিই প্রায় মরে গিয়েছিল। এখন দুর্নীতির পরিবেশ থেকে আমরা যদিও মুক্ত হতে পারিনি, তবে এর ভেতর থেকেও এগিয়ে চলার সোপান দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সামর্থ্য সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কতটা হবে। জবাবদিহির পরিবেশ থাকলে সব শ্রেণির মানুষ তাদের অধিকারের দাবি জানাতে পারে। এ জন্য তো গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই। সব সাফল্যের পরও এই অসাফল্য আমাদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। বারবার মনে হচ্ছে, উন্নয়ন হলেও টেকসই উন্নয়ন থেকে বোধ হয় আমরা অনেকটা সরে যাচ্ছি। রাষ্ট্রপরিচালকরা দুর্নীতি কমিয়ে এবং দলপ্রেমে আটকে না থেকে যদি দেশপ্রেমের শক্তিতে দৃঢ় হতো পারতেন, তাহলে হয়তো বড় স্বপ্ন দেখতে পেত দেশবাসী।

‘অতি বেশি দলীয়করণ মানসিকতা রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের গণতান্ত্রিক বোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তারা হয়ে পড়ছেন অনেক বেশি উদ্ধত। মাঠের রাজনীতি করে এলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মোসাহেবদের বলয়ে বন্দি হয়ে পড়েন। এ কারণে গণতন্ত্র শুধু বক্তৃতার ভাষা হিসেবে টিকে থাকে। আর প্রায়োগিক ক্ষেত্রে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। তাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলের ভেতরে গণতন্ত্র অনেকটাই নির্বাসিত’

লেখক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত