টানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় ডুবে গেছে রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্পের আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুটি। গত মঙ্গলবার বিকেল থেকেই সেতুতে পর্যটক ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কর্র্তৃপক্ষ। প্রতি বছরই জুলাই-আগস্ট মাসে হ্রদের পানি বাড়তে থাকলে সেতু ডুবে যায়। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা বিভাগীয় কমিটির সদস্য ও রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী নজরুল ইসলাম এবং রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক (ডিসি) মামুনুর রশীদের ভাষ্য, পর্যটন সেতুটি নির্মাণের সময় কাপ্তাই হ্রদের রুল কার্ভ অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে প্রতি বছর বর্ষায় ডুবে যায় সেতুটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে রাঙ্গামাটি জেলা শহরের তবলছড়ি এলাকায় ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। দুই পাহাড়ের মাঝখানে দুটি পিলারের
ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি পর্যটন শহর রাঙ্গামাটির প্রতীক হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি পেয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ মিন সি লেভেল (এমএসএল)। স্বাভাবিক নিয়মে কাপ্তাই হ্রদে ১০৪.৬ এমএসএল পানি থাকলে তা কাপ্তাই বাঁধের নির্গমন পথের মাধ্যমে ছেড়ে দিতে হয়। এ বছর হ্রদের পানি ১০৬ এমএসএল হওয়ায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।
রাঙ্গামাটির পর্যটনশিল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, ১৯৮৬ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই। কাপ্তাই হ্রদে পানির ধারণক্ষমতার নিচে সেতু নির্মাণ করায় প্রতি বছরই এটি ডুবে থাকে। পরিকল্পনাহীনভাবে সেতুটি নির্মাণ করায় কাপ্তাই হ্রদের পানি সর্বোচ্চ স্তরে যাওয়ার আগে ঝুলন্ত সেতুটি ডুবে যাচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের ১০৯ এসএমএল পানির মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের নিয়ম না থাকলেও খোদ তা অমান্য করেছে এই সংস্থাটি। তাই কাপ্তাই হ্রদের পানি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর আগেই সেতুটি ডুবে যায়।
জেলা পর্যটন কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যেক মাসেই ঝুলন্ত সেতুর বিভিন্ন সংস্কারকাজ করতে হয়। এর মধ্যে প্রতি বছর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর হ্রদের পানি কমতে থাকলে সেতুর পানি নেমে যায়। এরপর সেতুর পাটাতনসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করতে হয়। এতে করে প্রতি বছরই সেতু ডুবে থাকার কারণে ৫০-৬০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়।
রাঙ্গামাটির পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের পরিচালক হেফাজত সবুজ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের কোনো ধরনের পরিকল্পনা আমরা দেখছি না। অপরিকল্পিতভাবে এই সেতু নির্মাণ করায় প্রতি বছরই এটি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকার কারণেই এখানে এই শিল্পের উন্নয়ন হচ্ছে না।’
উন্নয়নকর্মী ললিত সি চাকমা বলেন, ‘বলতে গেলে কোনো প্রকার পরিকল্পনাহীনভাবে ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ সারা দেশের মানুষ এটিকে ‘সিম্বল অব রাঙ্গামাটি’ হিসেবে জানে। সিম্বল অব রাঙ্গামাটি যদি এভাবে প্রতি বছর পানিতে ডুবে থাকে তাহলে এটা সিম্বল হলো কীভাবে? এ ক্ষেত্রে আমি বলব, এটি ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে আরও অত্যাধুনিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে নতুনভাবে কিছু করতে করতে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিলেই এ শিল্পের প্রসার ঘটবে; না হয় দিন দিনই পার্বত্য এই শিল্পের অধঃপতন হবে।’
রাঙ্গামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়–য়া বলেন, ‘গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে কাপ্তাই হ্রদের পানি অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে সেতুতে পর্যটক ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে সেতুর আশপাশের স্থানে নোটিস টানিয়ে দিয়েছি। সাধারণত হ্রদের পানি ১০৪ এমএসএল হলে আমাদের ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে ডুবে যায়। ১০৩ এমএসএল হলে ঝুলন্ত সেতুর নিচে পানি ছুঁইছুঁই থাকে।’
তিনি বলেন, ‘সেতুটি আরও ওপরে উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আমরা আগেও নির্মাণকাজে নিযুক্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। তারা যেটা জানিয়েছেন, সেতুটি এখন আরও ওপরে তুলে নেওয়ার মতো তেমন কোনো অবস্থা নেই। সেতুটি তোলার চেষ্টা করলে বিভিন্নভাবে ভেঙে যাবে। তাই এখন এটি নতুন করে পরিকল্পনা করে তৈরি করতে হবে।’
কাপ্তাই হ্রদে পানিবৃদ্ধির কারণে গত মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। ১৬টি জলকপাট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২৫ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিগর্মন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এ টি এম আব্দুজ্জাহের। তিনি জানান, হ্রদে ১০৬ এমএসএল পানি থাকায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট দেড় ফুট উচ্চতায় খুলে দেওয়া হয়েছে। হ্রদে বর্তমানে পানির উচ্চতা ১০৭.৪ এমএসএল, যা আগের থেকে বেড়েছে।
কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা বিভাগীয় কমিটির সদস্য ও রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি নির্দেশ মোতাবেক হ্রদের পানির রুল কার্ভ অনুসারে ১২০ এমএসএলের নিচে ঘরবাড়ি কিংবা যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের কোনো ধরনের বিধান নেই। আমি ঠিক জানি না, পর্যটন কর্র্তৃপক্ষ কীভাবে রুল কার্ভের নিয়ম উপলব্ধি না করে ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করেছে।’
রাঙ্গামাটির ডিসি এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘পর্যটন সেতুটি যখন নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন কাপ্তাই হ্রদের রুল কার্ভ অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রতি বছর বর্ষাতে সেতুটি ডুবে যাচ্ছে। তবে সেতুটি আমরা আরও উঁচুতে তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি।’
