আমরা শুনলাম ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কাজের টেবিলে উইনস্টন চার্চিলের বদলে থাকবে তার সত্যিকারের নায়ক গ্রিক উপকথার বীর পেরিক্লিসের আবক্ষ মূর্তি। কিন্তু দিগন্তে ব্রেক্সিটের উঁকি মারার সময় এটি কি সুসংবাদ?
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর এথেনীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা পেরিক্লিস ক্ষমতায় এসেছিলেন যুদ্ধে বীরত্ব আর বাকপটুতার জোরে। শত্রুদের নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন তিনি। বিপুল অর্থব্যয়ে গড়েছিলেন নতুন নতুন ভবন। ৩০ বছর ধরে তার এথেন্সে চলেছিল এক ‘স্বর্ণযুগ’। বরিস জনসন গত সপ্তাহে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। তবে পেরিক্লিসের বৈদেশিক কূটনীতি ছিল এক বিপর্যয়। গোঁয়ার্তুমিপূর্ণ ওই কূটনীতি আশপাশের রাজ্যগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক বৈরী করে তুলেছিল। তারা পেলোপনেশীয় যুদ্ধে স্পার্টাকে সহায়তা এবং শেষ পর্যন্ত এথেনীয় গণতন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে প্রতিশোধ নিয়েছিল। পেরিক্লিস কেবল তার প্রভাবশালী রক্ষিতা এস্পাসিয়ার পরামর্শ শুনতেন। কিন্তু এস্পাসিয়া একজন আধুনিক নেতার পরামর্শক হিসেবে বেমানান।
বরিস জনসনের আসল মডেল পেরিক্লিস নয় বরং তার পোষ্য এবং এথেন্সের নেতা হিসেবে তার সংক্ষিপ্তকালের উত্তরসূরি আলসিবিয়াদেস। একজন মেধাবী, সুদর্শন এবং আত্মপ্রেমী প্রেমিক ছিলেন আলসিবিয়াদেস। তারুণ্যের বদঅভ্যাসগুলো কখনোই ত্যাগ করতে পারেননি তিনি। পরবর্তী সময়েও তাকে দেওয়া দায়িত্বগুলো পালন করতে পারেননি ঠিকমতো। আলসিবিয়াদেসের রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল তার যৌন তাড়নার মতোই অনিশ্চিত। এথেন্সে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেললে তিনি এর শত্রু স্পার্টার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তারপর ভেড়েন স্পার্টার শত্রু পারস্যের দলে। তার এইসব কায়দাকৌশলের পালা শেষ হলে ব্যক্তিগত আকর্ষণ, ধূর্তামি আর ‘রেশমমসৃণ জিহ্বা’র ওপর ভর করে এথেন্সে ফেরেন আলসিবিয়াদেস। জনতা তার নিরলস আশাবাদকে স্বাগতই জানিয়েছিল। ‘আক্রমণ এড়াতে প্রথমে আঘাত করা’ ছিল তার জীবনের লক্ষ্য। যথারীতি আলসিবিয়াদেস এথেনীয়দের সামরিক পরাজয় এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যান। অল্পদিন পরই নির্বাসনে তাকে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক শত্রুদের কেউ কিংবা সদ্য পটানো এক কমবয়সী মেয়ের স্বজনরা কাজটি করেছিল বলে মনে করা হয়।
বরিস জনসন পেরিক্লিস জাতীয় কেউ নন। যত দোষত্রুটিই থাক, পেরিক্লিস এথেনীয় গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন। তার একটি ব্যাপকভিত্তিক আবেদন ছিল। এছাড়া ‘ব্যক্তিগত পার্থক্যগুলোর’ প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান ছিল তার। পেরিক্লিস ‘হার্ড ব্রেক্সিটের’ বিষয়ে যৌক্তিকভাবে সংবেদনশীল লোকদের কখনোই অপমান করতেন না। মশকরা করতেন না জীবন-জীবিকা নষ্ট হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন
কৃষকদের নিয়ে। বরিস জনসনের সঙ্গে আলসিবিয়াদেসেরই মিল বেশি। গণতান্ত্রিক আইন পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দিয়ে গোষ্ঠীতন্ত্রকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে নিজের এথেন্সে প্রত্যাবর্তন সম্ভব করেছিলেন আলসিবিয়াদেস। তার বক্তব্যে ছিল জনসনের মতোই জোশের ছোঁয়া। নিষ্ক্রিয়তা অপছন্দ ছিল আলসিবিয়াদেসের। তিনি বলেছিলেন, ‘যে মুহূর্তে ক্ষমতা হাতে আসবে তখন থেকেই তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যদের শাসন করা বন্ধ করলে আমরা নিজেরাই শাসিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ব।’ এথেন্সকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হবে, তাগিদ দিয়েছিলেন আলসিবিয়াদেস। বাস্তবে তিনি তা হারিয়েছেন।
বরিস জনসনের সাম্প্রতিক আচরণের যে বিষয়টি আরও বেশি প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে মেলে তা হচ্ছে, কার্যোদ্ধারের জন্য অতি আবেগ, ক্ষোভ, প্রতিশোধ ও ফাঁকা বুলির মতো বিভিন্ন হোমারীয় বৈশিষ্ট্যের শরণ নেওয়া। প্রাইয়ামের মতোই তিনি ট্রয়ের তোরণ থেকে শত্রুদের নিক্ষেপ করেন। অভিযোগ করেন সিদ্ধান্তহীনতা ও নৈরাশ্যবাদের। প্রাইয়ামের মতোই রাগ ও গর্বকে আগে স্থান দেন। ২০১৫ সালে ওয়েস্টমিনস্টারের সেন্ট্রাল হলে বরিস জনসন ইতিহাসবেত্তা মেরি বিয়ার্ডের সঙ্গে গ্রিস বনাম রোম বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। জনসন তার প্রিয় গ্রিসকে গণতন্ত্রের ‘দারুণ, পরিশীলিত আর বহুমুখী লালনভূমি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু আসলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এথেন্স ছিল মূলত রোমান্টিক, বুলিসর্বস্বÑ বিয়ার্ড যেমনটা দেখিয়েছেন। চূড়ান্তভাবে রোমই বিজয়ী হয়েছিল। ওই বিতর্কে ভোটেও জিতেছিলেন বিয়ার্ডই।
কবি ভার্জিলের বর্ণিত ‘শান্তির পন্থাসমূহ’ উপেক্ষা করার মাধ্যমে জনসন ক্ষমতার ওপর দুর্বল নিয়ন্ত্রণকে বিপন্ন করলে তা হবে এক অদ্ভুত ব্যাপার। তিনি তার পরাস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে মহা গোল বাধিয়েছেন। এতে তৈরি হয়েছে প্রাচীন গ্রিক নাটকের মতোই শত্রু দলের কলরব; যাতে রয়েছেন জেরেমি হান্ট, ফিলিপ হ্যামন্ড, পেনি মরডন্ট, ডেভিড গওকে, লিয়াম ফক্স ও ররি স্টুয়ার্ট। ১৯৮০ এর দশকে থ্যাচারের ‘ওয়েটস’ (রক্ষণশীল দলের যারা প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারের বেশি কট্টর নীতির বিরোধী ছিলেন অন্যপক্ষের কাছে তাদের পরিচিতি ছিল ‘ওয়েট’ হিসেবে) উপদলীয় বিভক্তির পর থেকে এটাই রক্ষণশীল দলের মধ্যে সবচেয়ে বড় অন্তর্কলহের ঘটনা। থ্যাচার বিদ্রোহীদের তাড়াতে দুবছর সময় নিয়েছিলেন। বরিস জনসন কাজটা করেছেন এক রাতে।
এটা ধরতেই হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী একটা বাজি ধরেছেন। তিনি এমন একটা সমঝোতার ব্যাপারে আশাবাদী যা আপাতত কাস্টমস ইউনিয়ন বহাল তথা আইরিশ সীমান্ত উন্মুক্ত রাখবে। জনসনের প্রত্যাশা এই যে, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও দলের অনুগত নেতাদের সমর্থনকে পুঁজি করে তিনি ‘গুটিবাজির’ প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সবাইকে পক্ষে টানতে পারবেন। মানাতে পারবেন যে, তার নতুন সীমান্ত চুক্তিটি ভালো। আর ইউরোপিয়ান রিসার্চ গ্রুপের স্পার্টান প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় সক্ষম একমাত্র জেনারেল তিনিই। ‘মুক্তবাণিজ্যের ভিত্তিতে বাদবাকি ইউরোপের সঙ্গে একটি রোমাঞ্চকর অংশীদারত্ব’ বলে জনসন ডাউনিং স্ট্রিটে যে মন্তব্য করেছেন তা তিনি সত্যিই বিশ^াস করেন। ব্যাপার তা-ই হলে ঝড় থেকে বেঁচে যাওয়া সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতা মাইকেল গোভের কাঁধে চাপবে বিশাল দায়িত্ব। দলের নেতৃত্ব নিয়ে বরিস জনসনের উপেক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, গোভ নতুন প্রধানমন্ত্রীর নড়বড়ে জাহাজে চেপে একরকম হারই মেনেছেন। তাকে অবশ্যই জনসনের ‘গণক’ ক্যাসান্ড্রা হয়ে উঠতে হবে। জনসনকে তার কার্যকলাপের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে হবে। সতর্ক করতে হবে গভীরভাবে বিভক্ত দেশ এবং পার্লামেন্টে গণতন্ত্রের হিসাব-নিকাশ নির্ভুল রাখার গুরুত্ব সম্পর্কেও।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে বরিস জনসন ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রিক নায়কের মতোই। তিনি প্রাণবন্তভাবে চেঁচিয়েছেন। রঙ্গ করেছেন প্রতিপক্ষকে নিয়ে। দৈববাণীর বাহকরা পাশেই ছিলেন। হাইমেটাস পর্বতের ঢাল দিয়ে মধুও ঝরছিল। যে দেবতারা এতদিন বরিস জনসনের গৌরবময় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তত্ত্বাবধান করেছেন তারা নিশ্চয়ই এখন তার ওপর সদয় নজর রাখবেন। অন্যদিকে দেবতাদের সম্মানে জনসন তৈরি করবেন এইচএস-২ সোনার মন্দির! যদি তা-ই হয় তবে পেরিক্লিসের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। দায়িত্বে এখন আলসিবিয়াদেস।
লেখক : যুক্তরাজ্যের বহুল প্রচারিত দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের কলামনিস্ট
ভাষান্তর আবু ইউসুফ
