চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডেঙ্গু পরীক্ষার উপকরণ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০১:৩১ এএম

ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট রি-এজেন্টের বাজারে বিশৃঙ্খলা কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে ৪০-১২৮ টাকা মূল্যের এই কিট দেশে বিক্রি হচ্ছে ৪০০-সাড়ে ৫০০ টাকায়। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে আমদানিকারক ও দোকানিরা এসব উপকরণের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। রোগীর চাপ থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোও বাধ্য হচ্ছে বেশি দামে এসব উপকরণ কিনতে। এর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। কোনো কোনো ক্লিনিকে সরকার নির্ধারিত ফি’র বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সংকট বাড়তে পারেÑ এই আশঙ্কায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এখনই বাজার নিয়ন্ত্রণে নামতে নারাজ। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ড্রাগ সুপার মাহবুব হোসেন

 

বলেন, সরবরাহ বাড়লে ও দেশে উৎপাদন শুরু হলে বাজার মনিটরিং করা হবে।

কিট ও রি-এজেন্টের সংকট কাটাতে আজ থেকে দেশেই শুরু হচ্ছে কিট উৎপাদন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আজ মঙ্গলবার থেকে দেশীয় কোম্পানি ওএমজি হেলথ কেয়ার কিট উৎপাদন শুরু করবে। এ ব্যাপারে মাহবুব হোসেন বলেন, এই কোম্পানি প্রতিদিন ৩৫ হাজার পিস উৎপাদন করতে পারবে। তাদের কাঁচামাল চলে এসেছে। এদের উৎপাদিত ‘এনএস১’ পরীক্ষার জন্য কিট ৩০০ টাকা ও আইজিজি ও আইজিএম রক্তের দুটি পরীক্ষার জন্য পৃথকভাবে ১৭৫ টাকা করে ও একসঙ্গে নিলে ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছি। সেগুলো বাজারে এলে আমদানি করা কিটের মূল্য নির্ধারিত হবে। তখন নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করতে হবে।

ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিনটি পরীক্ষা নির্ধারণ করেছে। এর একটি এনএসওয়ান (নন স্ট্রাকচারাল প্রোটিন-১)। অপর দুটি হলো আইজিএম (ইমিউনোগ্লোবিউলিন্স এম) এবং আইজিজি (ইমিউনোগ্লোবিউলিন্স জি)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান জানান, জ্বর হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এনএসওয়ান পরীক্ষা করানো হলে কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তা পজিটিভ আসবে। তবে তিন দিনের বেশি হলে তখন এনএসওয়ান পরীক্ষায় কোনো লাভ হবে না। তখন আইজিএম পরীক্ষা করাতে হবে। সেটিও জ্বর হওয়ার ৬ থেকে ৭ দিনের মধ্যে করাতে হবে। এরপর পরীক্ষা করালে পজিটিভ আসবে না। আর আইজিজি পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অনেক বছর আগেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তা জানা যাবে। এই পরীক্ষাগুলোর জন্যই মূলত আরডিটি কিট ব্যবহার করা হয়। রক্ত সংগ্রহ করে এই মেডিকেল ডিভাইসটিতে দিলে সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।

গতকাল রাজধানীর শাহবাগ ও তোপখানা রোডের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বিক্রির দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সংকট দেখিয়ে ১২০ টাকা মূল্যের প্রতিটি এনএসওয়ান কিট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া জানান, তারা আমদানিকারকদের থেকে প্রতিটি কিট গড়ে ৩০০ টাকা দামে কিনছেন। বাড়তি দাম দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যায় না। তবে আগের থেকে বাজারে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিটের বাড়তি মূল্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ দায় নিতে চান না। আমাদের আশঙ্কা, সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে উপকরণটি। তাই আমরা সরাসরি সরকারের কাছ থেকে কিট কিনতে চাই।

 বেসরকারি ক্লিনিক সমিতির সহ-সভাপতি ডা. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, কিট সংকটের কারণে দেশের অনেক ক্লিনিক ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারছে না। আবার যারা বাড়তি দামে কিনে পরীক্ষা করছেন তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে পরীক্ষা করায় লোকসান দিচ্ছেন। তাই কিটের একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে না দিলে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোকে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের দাবি, হয় আমাদেরও আমদানির অনুমোদন দেওয়া হোক অন্যথায় একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হোক।

বিষয়টি নিয়ে রবিবার বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম জানান, ডেঙ্গু একটি জাতীয় সমস্যা। এটা নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট সহ্য করা হবে না। আমদানি ও মূল্য সমস্যা নিয়ে তিনি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

অনেক হাসপাতালেই ডেঙ্গু শনাক্ত পরীক্ষা বন্ধ : কিট সংকটের কারণে গত তিনদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে ডেঙ্গু নির্ণয়ের পরীক্ষা বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (সিএমও) সারওয়ার জাহান বলেন, ‘ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট সংকটের কারণে আজ (সোমবার) এ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া শুক্র ও শনিবারও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বন্ধ ছিল। যারা কিট দিত তারা বলছে ৬ আগস্টের আগে কিট দিতে পারবে না।

আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, কিট না থাকায় বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল ডেঙ্গু শনাক্ত পরীক্ষা বন্ধ ছিল। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন বলেন, দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই কিটের সংকট। সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, তাদের সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে রোগীরা বাইরে থেকে পরীক্ষা করছে। দু-একদিনের মধ্যে নতুন কিট আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ভৈরবে এনএসওয়ান না থাকায় বন্ধ রয়েছে ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বুলবুল আহমেদ জানান, কিট না থাকায় নতুন কোনো রোগী এলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা সম্ভব হবে না। পটুয়াখালীতে কিট না থাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীদের বেশি টাকা দিয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা করতে হচ্ছে। পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাইদুজ্জামান জানান, সরকার থেকে তাদের মাত্র ৩০টি কিট দেওয়া হয়েছে। যা এই হাসপাতালের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

প্রতিদিন আসছে ২ লাখ কিট : ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিদিন ২ লাখ এনএসওয়ান কিট আমদানি করা হচ্ছে। এর বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালে এবং বড় একটা অংশ সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেডিকেল সরঞ্জামাদি বিক্রেতাদের কাছে।

বেড়েছে মশার কয়েল ও মশা নিধন ওষুধের দাম : ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী মশার কয়েলের চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মূল্য বাড়িয়েছে ব্যবসায়ীরা। বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগে যেসব কয়েলের প্যাকেট ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হতো সেগুলো এখন ৮৫-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অ্যারোসলের মূল্যও বেড়েছে ২০-৪০ টাকা। আর ১২০-১৪০ টাকা দামের ওডোমাস মলম বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।

 ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফরোজা রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় ক্রেতা সেজে ওডোমাস মলমের মূল্য যাচাই করেন। কয়েকটি দোকান তাদের থেকে ১২০ টাকার এই মলম ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা রাখেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ফার্মেসিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত হবে তাদের ব্যাপারে আরও কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত