আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন খাবার দেবে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষার হার বাড়ানো, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ শিক্ষার্থীকে খাবার দেওয়ার জন্য ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি, ২০১৯’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কর্মকৌশলের খসড়াটি অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। স্কুল মিল নীতিমালা ছাড়াও বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ‘চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় আইন, ২০১৯’-এর খসড়া এবং ‘মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৯’ খসড়ার নীতিগত অনুমোদনের বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা কাউন্সিল আইন, ২০১৮’-এর বিধানাবলি পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) সম্পর্কিত সমন্বিত/বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯’ এবং ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) ব্যতীত প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত/বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা, ২০১৯’-এর খসড়া, বাংলাদেশ-চীন যৌথ বিদ্যুৎ কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব, কম্পিউটার কাউন্সিলের আওতায় কোম্পানি গঠন করার প্রস্তাবও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরসহ অন্য মন্ত্রীদের বিদেশ সফরসংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করার কথা রয়েছে আলোচ্যসূচিতে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্কুল মিল নীতিমালা খসড়া করার আগে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে ১০৪টি উপজেলায় শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়ার এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি চালুর পর ওইসব স্কুলে কী পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে গবেষণা করেছে বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আইএমইডিসহ আরও দুটি সরকারি বিভাগ ও গবেষণা সংস্থা। এসব সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে মিল চালু আছে সেসব স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে, উপস্থিতির হার আগের তুলনায় ৫ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার সাড়ে ৬ শতাংশ কমেছে।
২০১৮ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারিতে দেখা যায় গত বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ছিল ৮৮ শতাংশ এবং ঝরে পড়ার হার ছিল ২০ শতাংশ।
বর্তমানে যেসব উপজেলায় স্কুল মিল চালু আছে তার অর্থ জোগান দিচ্ছে সরকার এবং বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি। সারা দেশের স্কুল মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে সরকারি বরাদ্দ দিয়ে। তবে অন্যান্য সূত্র থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। রান্না করা খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। যেসব উপজেলায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয় সেসব উপজেলায় উপস্থিতির হার বেড়েছে ১১ শতাংশ। আর যেসব উপজেলায় বিস্কুটসহ অন্যান্য খাবার সরবরাহ করা হয় সেসব উপজেলায় উপস্থিতির হার বেড়েছে ৬ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দৃশ্যমান এবং শিক্ষার গুণগত মানে অনুকূল পরিবর্তন হচ্ছে। রান্না করা খাবার সরবরাহকৃত এলাকায় রক্তস্বল্পতাও কমেছে বলে এসব গবেষণায় উঠে এসেছে।
স্কুল মিল কর্মকৌশলে বলা হয়েছে, দেশের ১ লাখ ৩৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এনে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হবে। খাদ্যঘাটতি এলাকা, দুর্গম চর, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল, পাবর্ত্য এলাকা, চা-বাগানসহ অনগ্রসর এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ কর্মসূচি চালু করা হবে। কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণের প্রয়োজনে জাতীয় স্কুল মিল কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। কর্মসূচি সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করার বিধান রাখা হয়েছে। স্কুল মিল কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন, উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সমন্বয়ে বিশ^ খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় ‘খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণা উন্নয়ন কেন্দ্র’ গঠন করার বিধান রাখা হয়েছে।
স্কুল মিল কর্মকৌশলে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরির ন্যূনতম ৩০ শতাংশ স্কুল মিল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে। খাবারের ধরন নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বাদ ও রুচি বিবেচনায় সাপ্তাহিক ভিত্তিতে খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করা হবে। ন্যূনতম চারটি খাদ্য গোষ্ঠী নির্বাচন করা হবে। প্রতিদিনের স্কুল মিলের খাদ্যে বৈচিত্র্য আনতে পুষ্টি চাল, পুষ্টি তেল, মৌসুমি তাজা সবজি ও ডিম দিয়ে খাবার তৈরি করা হবে। রান্না করা খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উচ্চ পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিস্কুটও দেওয়া হবে। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবকসহ স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করে খাবারের মেনু ও খাদ্যতালিকা নির্বাচন করা হবে। স্কুল মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকম-লী।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছি। সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদ আগামী সাড়ে চার বছরের মধ্যেই সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
সচিব আরও জানান, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী খালি পেটে স্কুলে যায়। পেটে ক্ষুধা নিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেওয়া কষ্টকর। বিদ্যালয়ে খাবার দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার পাবে। এর ফলে পরিবার থেকে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য আগ্রহও তৈরি হবে।
