কুমিল্লার দেবীদ্বারে সমাহিত হবেন আজ

মোজাফফর আহমদের কফিনে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০২:২৩ এএম

গণমানুষের আন্দোলন-সংগ্রামে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ছেড়ে নেমেছিলেন রাজনীতিতে। মানুষের মুক্তিসংগ্রামের আদর্শকে বুকে ধারণ করে কাটিয়েছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্ত্রিত্ব নিতে অস্বীকার করা অধ্যাপক মোজাফফর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারও নেননি। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিককে শেষ বিদায় জানাতে বিভেদ ভুলে গতকাল শনিবার এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলো।

গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৯ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশকে নেতৃত্বদানকারী মুজিনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর। উপমহাদেশে বাম ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে তিনি একজন কিংবদন্তিতুল্য। নিজেকে সব সময় ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন তিনি। কুঁড়েঘর ন্যাপের দলীয় প্রতীক।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয় অধ্যাপক মোজাফফরের মরদেহ। সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তিপর্যায়ে তার কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এর আগে সকালে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে জানাজা হয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাফফরের; সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়। পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। জানাজা শেষে অধ্যাপক মোজাফফরের জাতীয় পতাকা মোড়ানো কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে দেশবরেণ্য এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা আবারও পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান।

এর আগে অধ্যাপক মোজাফফরের কফিনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার সহকারী সামরিক সচিব শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও হুইপরা শ্রদ্ধা জানান।

১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোজাফফর আহমদ। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোজাফফর আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫৪ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কুমিল্লার দেবীদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন তিনি। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালেও অধ্যাপক মোজাফফর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজধানীর বারিধারায় মেয়ে আইভি আহমদ ও জামাতা সৈয়দ খালেদুজ্জামানের বাসায় ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী বেগম আমিনা আহমদ ন্যাপের কার্যকরী সভাপতি।

সংসদ প্লাজায় জানাজায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ অনেকে।

পরে অধ্যাপক মোজাফফরের মরদেহ নেওয়া হয় ধানমণ্ডিতে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এরপর দুপুর পৌনে ১টায় মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে শুরুতেই ন্যাপের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষে আবদুল মতিন খসরু, গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, অসীম কুমার উকিল, সুভাষ সিংহ রায়সহ অনেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

সেখানে আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজনীতিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্তকাল অনুপ্রেরণা জোগাবেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমাণ করে গেছেন, শুধু পদ-পদবির পেছনে ছোটাই রাজনীতি না। আদর্শের রাজনীতিই হলো প্রকৃত রাজনীতি।’

জাসদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার। পরে ইনু বলেন, ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে তার অবদান অনেক।’ শ্রদ্ধা জানানোর পর সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘অধ্যাপক মোজাফফর ন্যাপ নেতা ছিলেন বটে, কিন্তু রাজনীতির শুরুতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিরও একজন সদস্য ছিলেন।’ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন বলেন, ‘তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের শিক্ষক মোজাফফর আহমদকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। পরে ঢাবি উপাচার্য আখতারুজ্জামান বলেন, ‘তার লোভ-লালসাহীন রাজনীতি আগামী দিনের রাজনীতিবিদদের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।’ এ ছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ক্ষেতমজুর সমিতি, বাসদ, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে দ্বিতীয় জানাজা হয় অধ্যাপক মোজাফফরের। আজ রবিবার বাদ জোহর কুমিল্লার দেবীদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামের বাসভবনের সামনে তাকে সমাহিত করা হবে।

দেবীদ্বার উপজেলা ন্যাপের সভাপতি অনিল চক্রবর্তী জানিয়েছেন, সকাল ১০টায় কুমিল্লা টাউন হল মাঠে হবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের তৃতীয় জানাজা। সর্বশেষ এলাহাবাদ গ্রামে চতুর্থ জানাজা শেষে বাসভবনের সামনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হবে।

এদিকে বরেণ্য এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত