ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনে ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন পেতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে দলটির গেণ্ডারিয়া থানার সহসভাপতি আব্দুর রশীদ ভূঁইয়া ২ কোটি টাকা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, তবে ওই সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার অসম্মতিতে তিনি মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হন। পারিবারিকভাবে জুয়াড়ি হওয়ার
কারণেই রশীদকে প্রার্থী করতে রাজি হননি মায়া চৌধুরী। এদিকে এলাকাবাসী বলছেন, রশীদ ও তার ছোট ভাই গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া দেশেই আত্মগোপনে আছেন।
গত বুধবার পুরান ঢাকার বানিয়ানগর মুরগিটোলা ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে রশীদ-রুপনের ভাই এনামুল হক এনুর তিনটি সিন্দুক উদ্ধার করে র্যাব। সেখানে ৫ কোটি টাকা, ৮ কেজি স্বর্ণালংকার ও ৬টি অস্ত্র পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় মানি লন্ডারিং, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও অস্ত্র আইনে সূত্রাপুর, ওয়ারী ও গেণ্ডারিয়া থানায় সাতটি মামলা হয়েছে। এরপরই বানিয়ানগর মুরগিটোলার ভূঁইয়া পরিবারের ‘উত্থান ও সাম্রাজ্য বিস্তারের’ কাহিনী বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এনু-রুপন রাজধানীর মতিঝিলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের অংশীদার।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, একসময়কার লেদ মেশিন অপারেটর রশীদ ও তার ভাইয়েরা জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনোর টাকায় অল্প দিনেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। ঢাকায় ১৫-৩০টি বাড়িসহ শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন তারা। ভূঁইয়া পরিবার বিপুল অর্থ খরচ করে গেণ্ডারিয়া থানা ও দুটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় রশীদ ২ কোটি টাকা ব্যয় করে ৪০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান। মহানগর আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা তার পক্ষে থাকলেও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এর বিরোধিতা করেন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো জুয়াড়ি তার এলাকায় কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন পেতে পারে না।’ বর্তমানে গুলশানের বাসিন্দা মায়া চৌধুরী দীর্ঘদিন নারিন্দায় থাকতেন। পরে আর রশীদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো পুরনো বিষয়। রশীদ ভূঁইয়া মনোনয়ন চেয়েছিল এটা ঠিক। সবদিক থেকে যোগ্য বিবেচিত না হওয়ায় তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।’ এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
রুপন-রশীদ ঢাকাতেই আত্মগোপনে : রশীদ-রুপন ঢাকাতেই আত্মগোপনে আছেন বলে ধারণা এলাকাবাসীর। তারা বলছেন, গত বুধবার বাসায় অভিযানের পরও তাদেরকে এলাকায় দেখা গেছে। এরপর রশীদ-রুপন ও তাদের সহযোগীরা গা ঢাকা দেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা দুজনই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতে আছেন। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এ বিষয়ে র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল্লাহ বুলবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযানের আগেই এনামুল হক এনু থাইল্যান্ডে চলে গেছেন। তার বড় ভাই রশীদ ভূঁইয়া ও ছোট ভাই রুপন ভূঁইয়াসহ অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
জানতে চাইলে ওয়ারী থানার ওসি আজিজুর রহমান ও সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ মিয়া বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অভিযানের আগেই এনু থাইল্যান্ডে চলে গেছেন। রুপন ও তার সহযোগীরা গা ঢাকা দিয়েছে। প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
জুয়ার বোর্ডেই নগদ টাকার ব্যবসা : রশীদের মেয়ের শ্বশুর ইউসুফ বাদল একসময় পুরান ঢাকায় সবজির ব্যবসা করতেন। এখন তিনি ঢাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এনু-রশীদের হাত ধরে জুয়ার বোর্ডে নগদ টাকা লগ্নি করতেন ইউসুফ বাদল। তিনি প্রতিদিন নগদ টাকা নিয়ে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ঢুকতেন। জুয়ায় হারের পর জুয়াড়িদের নগদ টাকার প্রয়োজন হলেই তিনি গয়না বা ব্যাংক চেক রেখে টাকা ধার দিতেন। শর্ত থাকত প্রতি ৫ লাখ টাকায় তাকে দিতে হবে ৬ লাখ টাকা। পরে কেউ খেলায় জিতলে সঙ্গে সঙ্গেই সুদসহ পুরো টাকা পেয়ে যেতেন। আর হেরে গেলে পরদিন সুদসহ তাকে ওই টাকা ফেরত দিতে হতো।
