পেটানোর পর রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ লাগিয়ে দেওয়া হয়

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:২৬ এএম

বুয়েটে র‌্যাগিংয়ের নামে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগও এসেছে। নির্দিষ্ট কক্ষে ডেকে অশ্লীল নৃত্য বা অঙ্গভঙ্গি করতে বাধ্য করা হতো। নির্যাতন এতটাই পৈশাচিক ছিল যে, পেটানোর পর মাটিতে পড়ে থাকা শিক্ষার্থীর রক্তাক্ত মুখে লবণ লাগিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। থাপ্পড়ের কারণে এক শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফেটে যায়। পরে ওই শিক্ষার্থী আর ওই কানে শুনতে পেতেন না।

এমনকি মধ্যরাতে সেলুনে পাঠিয়ে বা হলেই চুল ও দাড়ি কাটতে বাধ্য করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। টিকিট কাটা সত্ত্বেও বাড়িতে যেতে দেয়নি। নেতাদের ডাকে লুঙ্গি পরে এলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। আর সালাম না দিলে প্রকাশ্যে যে কারও সামনে চড়-থাপ্পড় মারা বা কান ধরে উঠবস করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মারধরের সময়ও মাথা নিচু করে রাখতে হতো। চিৎকার করা যেত না। এমনকি

বস্তার ভেতর মাথা বেঁধে বেধড়ক পেটানোর অভিযোগও রয়েছে। বুয়েটে ছাত্রলীগের এমন বেপরোয়া কর্মকা-ের পেছনে হল প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকদের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযোগ করেছেন, এসব শিক্ষকই ছাত্রলীগের হাতে ক্যাম্পাস তুলে দিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের যে ওয়েবপেজটি বন্ধ করে দিয়েছে বিটিআরসি, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বুয়েট ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এসব অভিযোগ থেকে ও বুয়েটে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুয়েটে নিজস্ব আইন জারি করেছিল ছাত্রলীগ। প্রথমবর্ষের ছাত্রদের জন্য ছাত্রলীগের নিয়ম ছিল ভয়ানক রকমের কড়াকড়ি। এসবের মধ্যে রয়েছেÑ কেউ লুঙ্গি পরে ডাইনিংয়ে প্রবেশ করতে পারবে না, ক্যাম্পাসের হাফওয়ালে বসা নিষিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেতে প্রবেশ নিষিদ্ধ, চুল লম্বা করতে পারবে না, ফুলহাতা শার্ট গুটিয়ে রাখতে পারবে না, ছাত্রলীগ নেতাদের দেখলে অবশ্যই সালাম দেওয়াসহ অনেক কিছু। বেখেয়ালে কেউ একবার এই নিয়ম ভঙ্গ করলে তার নিস্তার ছিল না। রাতে টর্চার সেলে ডাকা হতো। এরপর প্রথমে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ। পরে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারা হতো। আর দ্বিতীয়বার কেউ এই ভুল করলে হলের ছাদে নিয়ে তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে হকিস্টিক, স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক পেটানো হতো।

বন্ধ হওয়ার আগে ওই ওয়েবপেজে ১৬৬টি অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে গত ৯ অক্টোবর এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘আমার নিজ চোখে দেখা। টিউশনি করে নজরুল হলে ঢোকার আগেই আউটার গেট থেকে শুনতে পেলাম গননবিদারী চিৎকার। ঢুকতেই দেখি ইউকসুর সামনে কেউ পড়ে আছে। তাকিয়ে দেখলাম যে মার খাচ্ছে সে পরিচিত এক ভাই, উনি কোরানের হাফেজ। শুভ্র জ্যোতি (ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির আগের কমিটির সভাপতি) তাকে মাটিতে ফেলে তার মুখম-লে লাথি দিচ্ছে। তারপর কোথা থেকে এক মোটা বাটাম নিয়ে এসে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে পেটাতে লাগল শুভ্র। কে যেন ক্যান্টিন থেকে লবণ এনে দিল ০৭-এর তন্ময়ের হাতে। সে ভাইকে তুলে তার রক্তাক্ত মুখে লবণ লাগিয়ে দিল। এরপর আর সহ্য করতে পারিনি। হলে চলে আসি। যে কদিন ক্যাম্পাসে ছিলাম, শুভ্র জ্যোতির দিকে তাকালেই তার সেই নৃশংস চেহারার কথা মনে পড়ত। তখন ডিএসডব্লিউ (ছাত্রকল্যাণ পরিচালক) ছিল দেলোয়ার। এই লোকটা সরাসরি দায়ী ছাত্রলীগের হাতে ক্যাম্পাসকে তুলে দেওয়ার পেছনে।’

শিক্ষার্থীরা এমন পরিস্থিতির জন্য বুয়েটের শিক্ষকদের দায়ী করেছেন। ওই পেজে এক শিক্ষার্থী গত ৯ অক্টোবর অভিযোগ করেন, ‘একটা সত্যি কথা বলি। বুয়েটের স্যারদের কোনো মোরাল ভ্যালুই নেই। তারা ক্লাসে এত ভাব নেয়, নিজেদের এত বড় কিছু মনে করে, সাধারণ স্টুডেন্টদের মানুষই মনে করে না। আর পলিটিক্যালদের সামনে কিছু বলার বা অ্যাকশন নেওয়ার সাহস নাই। ভিসি, ডিএসডব্লিউ এদের হেডম নাই। আর অন্য স্যারদের কথা কী বলব। আজ যদি স্যাররা চেক করত, অ্যাকশন নিত, তাহলে কি এত খারাপ পরিস্থিতি আসত? হলের প্রভোস্টরা সবচেয়ে বদ। এরা সব জানত হলে কী হয়। এদের একটারও সাহস নাই ছাত্রলীগের পোলাপালের সামনে কিছু বলবে। এর আগেও এমন অনেক কেস তারা মুখস্থ বলেছিল। এবার আবরার মারা গেছে দেখে টনক নড়েছে।’

গত ২৬ জুলাই ১০৪ নম্বর অভিযোগে এক শিক্ষার্থী লেখেন, ‘আহসানউল্লাহ হলের এক নেতা আমাদের এক বন্ধুকে থাপ্পড় মারে। আরেকবার এক সিনিয়রের কানের পর্দা ফাটায় দিছে। আর কোনোদিন এক কানে শুনতে পাবে না।’

গত ১৬ মে আহসানউল্লাহ হলের ১৮ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘রাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে। যা খুশি তাই বলে। গাল পারে। চুল ধরে টানে। শার্টের কলার ধনে টানে। কেউ ঘুম থেকে লুঙ্গি পরে এলে তাকে যা ইচ্ছা তাই বলে গালি দেয়। দাড়ি বড় থাকলে অসভ্য ভাষায় গালি দেয়। মধ্যরাতে দাড়ি-চুল কাটানো হতো। জোর করে পলিটিক্যাল মিছিল আন্দোলনে ধরে নিয়ে যায়। না গেলে মারে। বিশেষ করে রুমে সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্ট করে। এমন কিছু হয় যা মুখে বলা যায় না। আইটেম ড্যান্স দেওয়া, পর্নস্টারদের মতো অভিনয় করে দেখানো। রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার সময় মানুষরূপী শয়তানগুলো বের হয়ে আসে।’

আবরারের মৃত্যুর পরও এ পেজে শিক্ষার্থীরা বেশকিছু অভিযোগ লিখেছেন। এর মধ্যে গত ৯ অক্টোবর এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘আহসানউল্লাহ হলে ১৮ ব্যাচের রিয়াজকে ১৭ ব্যাচের প্লাবন বুয়েটে ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকেই হলের ছাদে তুলে প্রায় মারত। এই প্লাবনের বিরুদ্ধে সামান্য সালাম না দেওয়ার কারণে মারার অভিযোগ আছে। অভিজিতকে যেদিন কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়া হয় সেদিন রাতেই এক ছেলেকে প্লাবন থাপ্পড় মারে তাকে সালাম না দেওয়ার কারণে। আরেক ছেলেকে থাপ্পড় মেরেছিল হাফপ্যান্ট পরে টয়লেটে যাওয়ার কারণে।’

একই দিন আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘আমাকে তিতুমীর হলের ২০০৬ নম্বর রুমে ডেকে নিয়ে যায় ১২ ব্যাচের জাওয়াদ। আমার কোনো ধারণা ছিল না কেন ডাকা হয়েছে। সেখানে ০৯-এর শুভ্র টিকাদার, সিয়াম ও শুভ্র, ১০ ব্যাচের কনক, রাসেল আর ১১ ব্যাচের তানভির রহমান (টিআর নামে কুখ্যাত) আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আজগুবিভাবে আমি শিবির করি এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। প্রথমে তানভির আমাকে প্রচণ্ডভাবে এক থাপ্পড় মারে। আমার মাথা ঘুরে যায় এত জোরে থাপ্পড় খেয়ে, ঠোঁট কেটে যায়। এরপর তানভির আমাকে বুকে প্রচণ্ড এক লাথি মারে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। কেউ এসে তোলে আমাকে। এরপর আমাকে জোর করে স্বীকার করতে বলে যে আমি শিবির করি। স্বীকার না করলে আমার মাথায় একটা বস্তা পরিয়ে দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর শুধু মুহুর্মুহু রডের বাড়ি পড়তে লাগল পিঠের ওপরে। একজন মনে হয় টায়ার্ড হয়ে রডটা রাখতে আরেকজন রড হাতে তুলে নেয়। এভাবে থেমে থেমে এক ঘণ্টা বস্তাবন্দি হয়ে মার খেতে হয়েছিল।’

ওই শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন, ‘এবার মাথা থেকে বস্তা খুলে একজন এসে খুব আদর করে আমাকে রক্ষা করার ভান করে। এরপর আবার মার দিতে থাকে। একপর্যায়ে আমাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার হুমকি দেয়। শুভ্র এসে আমাকে পা ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরামর্শ শুনে কাজল আর রাসেল মিলে আবার আমার পা লক্ষ্য করে রড দিয়ে পেটানো শুরু করে। একপাশ হয়ে যাওয়ায় সব মার এসে লাগে বাম পায়ে। একপর্যায়ে আমাকে চলে যেতে বলে। যাওয়ার সময় হলের গেটে আমকে বলে কেউ জিজ্ঞেসা করলে বলবি রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করছিস। তখন রাত ৩টা। আমি এখন কোথায় যাব হল থেকে? কোনো রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে একফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিতুমীর থেকে বের হয়ে পলাশীর কাছে এসে একটা রিকশা নিয়ে আমার চাচার বাসায় চলে যাই। এরপরের বুয়েটের বাকি সময়টা একটা ট্রমা নিয়ে কাটিয়েছি। কোনো আনন্দ-উল্লাস কাজ করেনি, ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে কোনো ভালোবাসা কাজ করেনি। ঘৃণা আসত নির্লিপ্ত স্বার্থপর সব বুয়েটিয়ানের দিকে তাকালে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত