ভিন্নমত গান্ধীবাদী আদর্শ দেশদ্রোহ নয়

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১৯ এএম

ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করা গণতন্ত্রেরই একটি মৌলিক উপাদান।

ভারত মহাত্মা গান্ধীকে কী চোখে দেখে তা পরিষ্কার। কাগজে-কলমে আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধাবনত। বাস্তবে এ অনুভূতি অনুসরণ করার চেয়ে এর পরিপন্থী কাজই যে বেশি করা হয় তা আরেক ব্যাপার। কিন্তু আজ বেঁচে থাকলে গান্ধী আমাদের কীভাবে দেখতেন? চলতি মাসে গান্ধীর জন্মের সার্ধশতবার্ষিকী (অক্টোবর ২) পালনের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নটা কারও মনে জাগেনি। তবে আমরা তাকে বিব্রত করে থাকলে আমি অবাক হবো না। সত্যি বলতে, কখনো কখনো তিনি আজকের এই আমাদের অস্বীকার করতে পর্যন্ত চাইতে পারেন। এদেশে যেভাবে আমরা রাষ্ট্রদ্রোহ আইনটি ব্যবহার করি (ভারতীয় দ-বিধির ১২৪ এ ধারা) তা এর একটি নিখুঁত উদাহরণ।

অনেক আগে, সেই ১৯২২ সালের ১৮ মার্চ ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’তে গান্ধী ১২৪ এ ধারা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘নাগরিকের স্বাধীনতাকে দমন করার লক্ষ্যে ভারতীয় দ-বিধির রাজনৈতিক ধারাগুলোর মধ্যে প্রধান।’ এখন, ১২৪ এ ধারার সঙ্গে ‘সরকারের প্রতি অসন্তোষে উসকানি দেওয়ার’ প্রচেষ্টাটি যুক্ত। কিন্তু এ ব্যাপারে গান্ধী বরং ছিলেন আরও স্পষ্টবাদী। ‘আমি সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়াকে একটি গুণ হিসেবেই বিবেচনা করি ... যে পর্যন্ত না কেউ সহিংসতার চিন্তাভাবনা, প্রচার বা উসকানি না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার সর্বোচ্চ মাত্রায় অসন্তুষ্টি প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত।’

মহাত্মা গান্ধীর পক্ষে নিশ্চয়ই এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে বলা সম্ভব ছিল না। তারপরও রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইনটি বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের আরও ৪০ বছর সময় লেগেছিল। ১৯৬২ সালের কেদার নাথ সিংয়ের রায় অনুসারে সর্বোচ্চ আদালত এ ধারার প্রয়োগকে কেবল এমন সব কার্যকলাপ বা বক্তব্যের মধ্যে সীমিত করেছিলেন যা সুস্পষ্ট এবং অত্যাসন্নভাবে সহিংসতায় উনকানি দেয়। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এটিও যে, আদালত একে ‘অত্যন্ত জোরালো বক্তৃতা’ বা ‘সরকারের কড়া সমালোচনা’ থেকে পৃথক করেছিলেন।

ষাটের দশকে এভাবে রায় দেওয়ার পরে সর্বোচ্চ আদালত বিভিন্ন উপলক্ষে বারবার এই ব্যাখ্যাকেই অনুসরণ করে চলেছেন। ১৯৯৫ সালে বলবন্ত সিংয়ের মামলায় রায় দেওয়া হয়েছিল যে, ‘খালিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। জনসাধারণের তরফ থেকে প্রতিক্রিয়া জাগায়নি এমন নিছক স্লোগান দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য নয়।

আদালত ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে স্পষ্টভাবে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন: ‘আমরা বিবেচনার মাধ্যমে এ মত পোষণ করি যে, ভারতীয় দ-বিধির ১২৪ এ ধারার অধীন অপরাধগুলো পরিচালনা করার সময় কর্তৃপক্ষ কেদার নাথ সিংহ বনাম বিহার রাজ্য মামলায় সাংবিধানিক বেঞ্চের ঘোষিত নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হবে।’

দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা যেমন গান্ধীকে উপেক্ষা করি, তেমনি উপেক্ষা করি সুপ্রিম কোর্টকেও। অতিসম্প্রতি মুজাফফরপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি লেখা ৪৯ জন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বিহার পুলিশকে। পুলিশ তৎক্ষণাৎ ওই আদেশ পালন করে। অথচ দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি অজিত শাহ বলেছেন: রাষ্ট্রদ্রোহিতা দূরে থাক, কোনো অপরাধমূলক কাজই সংঘটিত হয়নি। সুতরাং মুজাফফরপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ উভয় পক্ষই ভুল কাজ করেছে। গান্ধীই সবার আগে তাদের সমালোচনা করতেন। কিন্তু আজকের শাসকরা এ ঘটনায় নীরব থেকেছেন।

পরবর্তীকালে যদিও বিহার পুলিশ ওই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে, সত্য কথাটি হচ্ছে; আমাদের পুলিশ বারবার এবং ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের অপব্যবহার করেছে। আর প্রতিবার সরকার তাদের এর সুযোগ করে দিয়েছে। এটি কার্টুনিস্ট, ছাত্র, ইতিহাসবিদ, লেখক, অভিনেতা এবং পরিচালকদের বিরুদ্ধে ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে কখনই সরকারের পক্ষ থেকে কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেননি।

এমনকি শিক্ষিত ও পরিশীলিত রাজনীতিবিদদেরও ভুল করার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে ২০১৭ সালের একটি ভাষণে অরুণ জেটলি বলেছিলেন, ‘বাক স্বাধীনতা আপনাকে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত করার অনুমতি দেয় না।’ তিনি ভুল বলেছিলেন। ‘খালিস্তান জিন্দাবাদ’  স্লোগান রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য নয় এ কথা ঘোষণা করে ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট ঠিক এ অভিমতই দিয়েছিল।

আজ সরকারের সমালোচনার জন্য (যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার) প্রায়শই রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ ভারতীয় দ-বিধির বিভিন্ন ধারার অধীনে শাস্তি দেওয়া হয়। এর অর্থ কি এই নয় যে, আমরা গান্ধীর সেই বিখ্যাত কথাটি ভুলে গেছি : ‘আমি সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়াকে একটি গুণ হিসেবেই বিবেচনা করি’?

সিএন আন্নাদুরাই ১৯৬২ সালে রাজ্যসভায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘দ্রাবিড়রা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চায়। দক্ষিণ-ভারতের জন্য আমরা একটি পৃথক দেশ চাই।’

আন্নাদুরাইয়ের কথায় নেহরু হয়তো ভড়কে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার বাকস্বাধীনতার অধিকারকে মেনে নিয়েছিলেন। সেটাই ছিল সত্যিকারের গান্ধীবাদ। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ কি ২০১৯ সালে একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখাবেন?

গান্ধী সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। যৌক্তিকভাবে বলা যায়, কোনো দেশ গণতান্ত্রিক কিনা তা নির্ধারণ করার মৌলিক নীতিমালাই এটি। কিন্তু আজ, সমালোচক এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের পাকিস্তানে যেতে বলা হচ্ছে। যাই হোক, গান্ধী সম্ভবত একে স্বাগতই জানাতেন। তিনি তো প্রতিবেশী দেশটিকে আজকের এদের মতো অপছন্দ করতেন না।

লেখক : ভারতের বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং আলোচিত স্মৃতিকথা ‘ডেভিল’স অ্যাডভোকেট: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’র লেখক

হিন্দুস্থান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত