আবেদন থেকে শুরু করে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা আর নানারকম হয়রানির অভিযোগ অনেক দিনের। বিশেষত পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে নাগরিক হয়রানির অভিযোগের যেন শেষ নেই। এখন অনলাইনে আবেদন করার সুবিধাসহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোর সেবার পরিধি বাড়ানোয় পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আগের তুলনায় অনেক কিছুই সহজ হয়েছে। কিন্তু আবেদনকারী কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কি না, সেসব যাচাইয়ের জন্য পুলিশের ভেরিফিকেশনের বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সুপারিশের পর এবার পুলিশ ভেরিফিকেশন বহাল রাখার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটিও।
বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘পাসপোর্ট ইস্যুতে পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বক্তব্য তুলে ধরা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যক্তির নাম-ঠিকানাসহ সব ধরনের তথ্য
থাকার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই কমিটির সভাপতি ফারুক খান। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম (বীরউত্তম) পাসপোর্ট ইস্যুতে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিল চেয়ে একটি নোটিস দেন। এর আগে ২০১১ সালে পাসপোর্ট অধিদপ্তরও পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিলের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। তবে পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখা তাতে আপত্তি তোলে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনও পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র ২০১৭ সালের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন এমন নাগরিকদের তিন-চতুর্থাংশকেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হয়ে ‘ঘুষ বা নিয়ম-বহিভর্‚ত টাকা’ দিতে হয়। এ কারণে টিআইবিও পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
পাসপোর্টের জন্য নাগরিকদের আবেদনপত্র হাতে পেয়ে প্রাথমিক কাজ শেষ করে পাসপোর্ট অফিস আবেদনকারীর তথ্য যাচাইয়ের জন্য পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা এসবি কার্যালয়ে পাঠায়। জেলা পর্যায়ে হলে সেটা যায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট থানার একজন উপ-সহকারী পরিদর্শক বা এএসআই, সহকারী পরিদর্শক বা সাব-ইন্সপেক্টর কিংবা ইন্সপেক্টরকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ঐ কর্মকর্তা তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে পাসপোর্ট অফিসে যে প্রতিবেদন পাঠান সেটাই ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ নামে পরিচিত। কিন্তু এখন যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের সময় নাগরিকদের পরিচয় যাচাই করা হয়ে থাকে এবং সে তথ্য কর্র্তৃপক্ষের ডাটাবেইসে রক্ষিত থাকে সেহেতু পাসপোর্ট প্রদানের সময় নতুন করে পরিচয় যাচাইয়ে প্রয়োজন রয়েছে কি না অনেকেই এই প্রশ্ন তুলছেন।
প্রকৃতপক্ষে জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা নাগরিকদের তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেইসের তথ্যাবলির বহুমুখী ব্যবহার সম্ভব। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পুরোপুরি ডিজিটালাইজেশন না হওয়া এবং এই তথ্যাবলি অন্যান্য সরকারি সংস্থা বা দপ্তর কারা কতটুকু এবং কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের যথাযথ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে, এ বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না যে, পাসপোর্ট বা এমন অন্য কোনো বিষয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন আসলে কেবল ঠিকানা বা নাম-পরিচয় যাচাইয়ের বিষয় নয়; বরং উক্ত নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ বা মামলা-মোকদ্দমা রয়েছে কি না সেটাও যাচাইয়ের বিষয়। এক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের মতোই পুলিশের বিভিন্ন থানার মামলা-মোকদ্দমা এবং অন্যান্য অপরাধের হালনাগাদ তথ্যাবলিও ডিজিটাল ফরমেটে রক্ষিত থাকলে পাসপোর্ট অফিস এবং পুলিশ উভয়ে উভয়ের তথ্যভাণ্ডার শেয়ার করে সংক্ষিপ্ততম সময়েই এই ভেরিফিকেশন করা সম্ভব। অর্থাৎ পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে না দিয়েও ব্যবস্থাটি সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে একটি অ্যাপস চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যে অ্যাপসটি ব্যবহার করে আবেদনকারী জানতে পারবেন যে, তার আবেদনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং তিনি কবে পাসপোর্ট হাতে পাবেন কিংবা কী কারণে কতদিন দেরি হবে। এছাড়া প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট ইস্যু করারও কথাও বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পাসপোর্ট ইস্যুকে ঘিরে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান রয়েছে পুরো প্রক্রিয়াটির ডিজিটালাইজেশন এবং জাতীয় তথ্যভাণ্ডারসমূহ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে। এজন্য পাসপোর্ট অফিসকে এই সেবা ওয়ান স্টপ সার্ভিসে নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশন বা এ জাতীয় বিষয়গুলোকেও ডিজিটালাইজড করতে হবে। তাহলে এই প্রক্রিয়া অধিকতর স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। সরকার বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পথে হেঁটে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে যাবে সেটাই কাম্য।
