ডিসির চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

হুইপের অপেক্ষায় সেই মুক্তিযোদ্ধার ছেলে

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৪০ এএম

দিনাজপুরের সেই মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলাম জেলা প্রশাসকের (ডিসি) চাকরিতে পুনর্বহালের প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন স্থানীয় সাংসদের সঙ্গে কথা বলার পর। গতকাল রবিবার তার বাবার কুলখানি ও দোয়া মাহফিল শেষে তিনি এ কথা জানান।

নুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা তো চিঠি দিয়ে গেছে হুইপ সাহেব বরাবর। ওই চিঠি হুইপ সাহেবের কাছেও গেছে। আমি এখন হুইপ সাহেবের অপেক্ষায় আছি। তিনি আমাকে এ বিষয়ে কী বলেন– সেটার অপেক্ষায় আছি।’

এ বিষয়ে জানতে সংসদের হুইপ ও স্থানীয় সাংসদ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কাল (আজ সোমবার) সকাল ৯টায় আমি এলাকায় যাব। এরপর মুক্তিযোদ্ধার কবর জিয়ারত করব। তারপর ওই পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত জানাব।’

দিনাজপুরের সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের কুলখানি ও মিলাদ মাহফিলের পর কবর জিয়ারত করেন মুক্তিযোদ্ধার স্বজন ও এলাকার লোকজন।

গত ২৪ অক্টোবর জেলার এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর দুদিন আগে তিনি তার ছেলে নুরের চাকরিচ্যুতি ও বাস্তুচ্যুতির বিষয়ে স্থানীয় সাংসদ বরাবর একটি চিঠি লেখেন বলে জানা গেছে। এসি-ল্যান্ড, এডিসি, ডিসি ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ এনে লেখা ওই চিঠির অনুলিপি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আছে।

এসি-ল্যান্ড আরিফুল ইসলামের স্ত্রী তাসমিম সুলতানার বিরুদ্ধে চিঠিতে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে তিনি দাবি করেছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমি অফিসিয়াল কোনো কিছুর বিষয়ে বলতে চাই না। আমার চাচা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো একদম বানোয়াট ও মিথ্যা। আমার বাসায় গত দেড় বছরে কয়েকজন কাজের লোক ছিল। তাদের সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করত।’ তিনি বলেন, ‘যারাই কাজ করতে আসে, তারাই আমাদের কাছে খাসজমি, চাকরির তদবির করে থাকে। যারাই আমাদের এসব প্রস্তাব দেয়, আমি তাদের আমার বাসায় কাজ করতে মানা করি। অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়া যদি আমার স্বামী এবং আমার দোষ হয়, তাহলে বিষয়টি আপনারাই বিবেচনা করুন কী হতে পারে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ডিসি মাহমুদুল আলম মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলামকে তার কার্যালয়ে ডেকে চাকরি এবং সরকারি বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেন। পরদিন শুক্রবার জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম সদর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লোকমান হাকিমকে নিয়ে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর গত শনিবার ডিসির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন নুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাকে ডিসি স্যার চাকরি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু আমি চাকরি করব না বলে জানিয়েছি। বিষয়টি হুইপ মহোদয় দেখবেন।’

গতকাল নুর আরও বলেন, ‘আমি তিনটি জিনিস চেয়ে বিচার চেয়েছি। এর মধ্যে আমার চাকরি, বাড়ি এবং এসি-ল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি রেভিনিউ ও এসিকনের বিচার চেয়েছি। যেহেতু ডিসি স্যারের সঙ্গে এসিকন আমাকে দেখা করতে দেয়নি এজন্য আমি ডিসি স্যার বাদে বাকি চারজনের বিচার দাবি করছি।’

নুর ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘এডিসির (রেভিনিউ) গাড়িচালককে এসি-ল্যান্ড ডেকে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মাদকসেবনের একটি লিখিত প্রত্যয়নপত্রে সই নিয়েছে।’ বিষয়টি তদন্ত কমিটির রংপুর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের (রাজস্ব) কাছে গাড়িচালক আব্দুর রহমান স্বীকারও করেছেন বলে জানান তিনি।

এডিসির (রেভিনিউ) গাড়িচালক আব্দুর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০টার সময় এসি-ল্যান্ড আমাকে তার অফিসে ডেকে নেন। এ সময় তিনি নুর ইসলাম মাদকাসক্ত এই মর্মে আমার কাছ থেকে একটা লিখিত নেন। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বলেন, কোনো সমস্যা নেই, এটা আমার নিরাপত্তার জন্য। পরে আমি বিষয়টি এডিসি স্যারকে জানাই। তিনিও একই কথা বলেন, সমস্যা নেই, তিনি হয়ত তার নিরাপত্তার জন্য নিচ্ছেন।’

তবে এসি-ল্যান্ড আরিফুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি আব্দুর রহমানকে কয়েকটি কাজের জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু কোনো কাগজে সই নেওয়া হয়নি।’

ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শনিবার এসি-ল্যান্ড অফিস থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধার পরিবারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছি। দুই-এক দিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।’

দিনাজপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমাকে আমার গাড়িচালক সই করার বিষয়টি মোবাইল ফোনে জানিয়েছিল। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত