মুরগির ভ্যাকসিনের ১০ হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে বিদেশ

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:০৯ এএম

দেশে পারিবারিক ও বাণিজ্যিক দুভাবেই মুরগি পালন বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ২২ কোটিরও বেশি মুরগি রয়েছে। এসব মুরগির রোগ প্রতিরোধে প্রতি বছর যে পরিমাণ ভ্যাকসিন লাগে, তার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই ভ্যাকসিনের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয় আর এর অনুমোদন প্রক্রিয়াও কম জটিল নয়। সরকারিভাবে সামান্য পরিমাণ ভ্যাকসিন উৎপাদিত হলেও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তা করে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রি খাতকে টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বায়ো-সিকিউরিটি বা জৈব নিরাপত্তা ও রোগ প্রতিরোধের দিকে মনোযোগী হয়েছেন উদ্যোক্তারা। এজন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে ভ্যাকসিন ব্যবহারের দিকে হাঁটছেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. গিয়াস উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। এজন্য গ্রামগঞ্জের মানুষও নিজেদের পালিত হাঁস-মুরগিকে ভ্যাকসন দিতে চায়। রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তমÑ এটা সবাই বুঝে গেছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনকারীরা। কারণ পশুপাখিকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো খারাপ, কিন্তু ভ্যাকসিনের কোনো ক্ষতি নেই।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ভ্যাকসিন আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। এখন দেশের ২২ কোটি মুরগির জন্য ভ্যাকসিন প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় ৫-৬ কোটি ভ্যাকসিন। বাকিটা আমদানি করতে হয়। পোলট্রি ছাড়া অন্যান্য পশুর ভ্যাকসিনও আমদানিনির্ভর।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, খানা শুমারিতে দেশে মোট মুরগির সংখ্যা ১৮ কোটি ৯২ লাখ ৬২ হাজার ৯০১টি। হাঁসের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৯ হাজার ২১০টি। টার্কির সংখ্যা ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪২০টি। এ বিষয়ে বিবিএসের কৃষি শুমারি ২০১৯ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) জাফর আহামেদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই হিসাবে খামারের মুরগি হিসাব করা হয়নি। খামারের মুরগির হিসাব ধরলে এটি আরও বাড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একটি মুরগির জীবনচক্রের কয়েকটি ধাপে ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হয়। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে একদিনের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত অনেকগুলো ডোজ দিতে হয়। তবে মাংস উৎপাদনের চেয়ে ডিম উৎপাদনকারী খামারে ভ্যাকসিন বেশি প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে দেশি মুরগির ক্ষেত্রে এটি কম লাগে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত লেয়ার মুরগির জন্য মারেক্স, রানীক্ষেত, গামবোরো, ব্রংকাইটিস, বসন্ত, সালমোনেলা, করাইজা জাতীয় ভ্যাকসিন বেশি প্রয়োজন হয়। আর ব্রয়লার মুরগির জন্য মারেক্স, রানীক্ষেত, গামবোরোই যথেষ্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আমদানিকারক জানান, দেশে ভ্যাকসিনের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যার প্রায় পুরোই চলে যায় বিদেশে। কারণ আমদানিনির্ভরতা।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্যমতে, দেশের সব পশুপাখির ভ্যাকসিন ও অন্যান্য ওষুধ মিলিয়ে অনেক ওষুধ প্রয়োজন, যা বাজারমূল্য ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। দেশে বিএলআরআই কিছু ভ্যাকসিন উৎপাদন করে, বাকিটা আমদানি করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রাণিস্বাস্থ্য ও প্রশাসন) ড. আবু সুফিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, লেয়ার মুরগির জীবনচক্রের কয়েকটি ধাপে ভ্যাকসিন প্রয়োজন হয়। ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে না। এ ক্ষেত্রে প্রতি বছর দেশের এসব মুরগির জন্য ১১০০ থকে ১২০০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন লাগে। এর বাজারমূল্যও অনেক বেশি। তিনি বলেন, এসব ভ্যাকসিনের সিংহভাগ আমদানি করতে হয়। তবে দেশি কিছু বিনিয়োগকারী এখন ভ্যাকসিন উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে ওষুধ খাতের কোম্পানি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ধামরাইয়ে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তারা শিগগিরই উৎপাদনে আসবে।

আমদানিতে জটিলতা : শীত আসার আগেই পোলট্রি খাতের জন্য এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু) ‘এইচ৯এন২’ নামের ভ্যাকসিন আমদানি করতে চায় উদ্যোক্তারা। এ নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে আবেদনও করেছে পোলট্রি উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিপিআইসিসি। কিন্তু অদ্যাবধি এর অনুমোদন মেলেনি। এ বিষয়ে বিপিআইসিসি সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ২০০৭, ’০৯ ও ’১১ বার্ড-ফ্লু ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে দেশের পোলট্রি শিল্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। খামারের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বর্তমানে লো-প্যাথজেনিক ভাইরাস ‘এইচ৯এন২’ এর কারণে ডিমের উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সব ধরনের খামারি। তিনি বলেন, শীতকাল আসন্ন। খামারে মুরগির বাচ্চার উৎপাদন কয়েক কোটি বেড়েছে। তাছাড়া সোনালি মুরগির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ কারণে রোগ-জীবাণুর বিস্তার ঘটেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে চলতি বছর রোগ-জীবাণুর ভয়াবহ সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন খামারি ও উদ্যোক্তারা। এজন্য এ ভ্যাকসিন আমদানি জরুরি।

বিপিআইসিসি সভাপতি বলেন, ‘আমরা বায়ো-সিকিউরিটির দিকে চলে যাচ্ছি। পোলট্রি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার চাই না। রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের দিকে যাচ্ছে পোলট্রি খাত। এজন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ভ্যাকসিনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতেও তাই হয়ে থাকে। এজন্য এটা আমাদের টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি শিগগিরই বাংলাদেশ ডিম ও মাংস রপ্তানি করবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে পোলট্রিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। বড় কোনো ভাইরাস না এলে তাদের খামারগুলোতে রোগ-জীবাণু ছড়ায় না। কেননা তারা জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে খামার তৈরি করে। বাংলাদেশও সেদিকে যাচ্ছে, যা পোলট্রি সেক্টরের টেকসই উন্নয়নের জন্য সহায়ক।’ তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন সরকারিভাবে কিছু উৎপাদন করা হয়। কিন্তু পরিমাণে বেশি না। তবে ওষুধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাকসিনের উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মার্কেট অ্যানালাইসিস করে শিগগিরই ভালো কিছু কোম্পানি আসবে বলে আশা করছি।’

ভ্যাকসিন আমদানিতে জটিলতা কেনÑ জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমদানির অনুমতি দেওয়ার আগে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এর মধ্যে আগে এ ভাইরাসের অস্তিত্ব দেশে ছিল কি না সেটার রেকর্ড দেখা হয়। বিপিআইসিসির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত