বাছাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে করতে না পারার জের

১৪ লাখ আবেদন নিয়ে বিপাকে খাদ্যের ডিজি

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৩২ এএম

সরকারি দপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শূন্য পদে জনবল বাছাইয়ে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা না নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। প্রায় ১৪ লাখ আবেদনকারীর লিখিত পরীক্ষা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে নেওয়ার প্রস্তাব চ‚ড়ান্ত করার পর এমন সিদ্ধান্তে খাদ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ বিপুলসংখ্যক এ প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার সামর্থ্য সরকারি কোনো সংস্থারই নেই। একদিকে শূন্য পদ পূরণের তাগিদ, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী সামাল দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. নাজমানারা খানুম।

তিনি গত সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১১শর কিছু বেশি পদের জন্য প্রায় ১৪ লাখ প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়া সহজ কাজ নয়। আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারির পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আর পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করছি।’

গত ২৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং অধীনস্থ দপ্তরে বেতন গ্রেড ১৩ থেকে ২০ পর্যন্ত পদে কর্মচারী নিয়োগের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

সরকারের ১৩ থেকে ২০তম গ্রেড হচ্ছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদ। বর্তমানে এই দুই শ্রেণির অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬২২টি। সরকারের সাড়ে তিন লাখ শূন্য পদের মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭২১টি।

গত কয়েক বছর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে ও তদবির ঠেকাতে বিভিন্ন দপ্তর নিজেরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের

ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে (এমআইএসটি) দায়িত্ব দেয়। এসব প্রতিষ্ঠান আবেদনকারীদের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়ন শেষে মেধাক্রম অনুযায়ী তালিকা করে নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। এরপর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দিয়ে থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিয়োগ দিতে গেলে সেই নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দারস্থ হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। এতে করে সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ফিরে আসে। এ প্রক্রিয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা বিপুলসংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা শুরু করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করার পর আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের অধীনস্থ সংস্থা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্র্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) এ ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. নাজমানারা খানুম এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইনের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ার লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তাদের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো জবাব দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে তারা মৌখিকভাবে জানিয়েছে তাদের অনাপত্তির কথা। কিন্তু শিক্ষক নিবন্ধন কর্র্তৃপক্ষ শুধু শিক্ষক নিবন্ধনের পরীক্ষাই নিতে পারে। আইন অনুসারে তারা অন্য বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা নিতে পারে কি নাÑ তা খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

খাদ্য অধিদপ্তর ২৪ ধরনের (ক্যাটাগরি) ১ হাজার ১৬৬টি শূন্য পদের বিপরীতে দরখাস্ত আহŸান করেছিল ২০১৮ সালের ১১ জুলাই। আবেদন করার শেষ দিন ছিল একই বছরের ১৪ আগস্ট। সেই দিন পর্যন্ত এসব পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৩ জন। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে আবেদন করেছেন প্রায় ১ হাজার ১৮২ জন। সব আবেদনকারীকেই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ডাকা হবে। লিখিত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরের। আর মৌখিক পরীক্ষা মাত্র ১০ নম্বরের।

খাদ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা জানান, এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। তাই এসব প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আমরা আইবিএ, এমআইএস, বুয়েট ও এমআইএসটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। এই চার প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে এমআইএস এই পরীক্ষা নিতে ২৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাব নিয়ে আমরা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতেও গিয়েছিলাম। প্রস্তাবে ত্রæটির জন্য সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। নতুন করে আরও কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র জারি করা হয়।

খাদ্য অধিদপ্তরের ২৪ ধরনের পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টরের (এএসআই)। এর ২৭৪টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫২টি। এএসআইয়ের প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন ২ হাজার ৩১৩ জন। এর পরই রয়েছে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদ। এর ২৫০টি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করবেন ৪ লাখ ১১ হাজার ৮৯৬ জন। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন ১ হাজার ৬৪৭ জন।

এসআই ও এএসআই ছাড়াও আরও ২২ ধরনের পদে জনবল নিয়োগ হবে। এগুলোর মধ্যে স্টেনোগ্রাফার কাম কম্পিউটার অপারেটরের ৮টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১ হাজার ৮৪৩ জন। স্টেনো-টাইপিস্ট কাম কম্পিউটার অপারেটরের ১৫টি পদের জন্য ২ হাজার ৪৩৪টি। এছাড়া ৩১টি আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ৪২ হাজার ৬০৪টি, ১৬টি অডিটর পদের জন্য ২৫ হাজার ৫৩৯টি, ৬টি অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম ক্যাশিয়ার পদের জন্য ৩ হাজার ৮০৬টি, ২টি ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদের জন্য ৪১৮টি, ১টি ফোরম্যান পদের জন্য ৩০৭টি, ২টি মেকানিক্যাল ফোরম্যান পদের জন্য ২৭১টি, ২০টি অপারেটর পদের জন্য ৩০৬টি, ৯টি ইলেকট্রিশিয়ান পদের জন্য ১ হাজার ১৯৫টি, ১টি ভেহিক্যাল ইলেকট্রিশিয়ান পদের জন্য ১৭টি, ৩টি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোরম্যানের জন্য ৮৯টি, ৩টি মিল রাইট পদের জন্য ৬৫টি, ৪০২টি অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট পদের জন্য ২ লাখ ২৪ হাজার ৬৩০টি, ৬টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদের জন্য ১ হাজার ৪৭৬টি, ৮টি ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ২ হাজার ৮০৭টি, ১১টি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ৮১টি, ৬টি সর্দার পদের জন্য ১৫টি, ৪টি ভেহিক্যাল মেকানিক পদের জন্য ১৯টি, ৫টি অ্যাসিস্ট্যান্ট মিল রাইটের জন্য ৪৬৫টি, ৫৬টি সাইলো অপারেটর পদের জন্য ৪৬৫টি ও ২৭টি স্প্রেম্যান পদের জন্য ২৪ হাজার ৬৭৫টি আবেদন জমা পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত