নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেন ‘মাদকাসক্ত’ ছিলেন বলায় জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে ক্ষমা চাইতে বললেন নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি। এক বিবৃতিতে ওই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে রাঙ্গাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু।
রাঙ্গার বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার বিকেল ৪টা থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছেন নূর হোসেনের মাসহ পরিবারের সদস্যরা। জাপা মহাসচিব তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তারা অবস্থান চালিয়ে
যাবেন বলে জানিয়েছেন।
নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি, তার তিন ভাই, এক বোনসহ পরিবারের ১২ সদস্য এই অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। চোখ মুছতে মুছতে নূর হোসেনের মা বলেন, ‘আমার ছেলে একটা সিগারেট পর্যন্ত খেত না। তাহলে মশিউর রহমান রাঙ্গা কোন বিবেকে এই কথা বলল? সে কি এসে দেখেছে আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হইছে। ও জনগণের জন্য রাজপথে নেমেছিল, বড়লোক হওয়ার জন্য না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি জনগণের কাছে বিচার চাই। তাকে (মশিউর রহমান) ক্ষমা চাইতে হবে। না চাওয়া পর্যন্ত আমি বুড়ো মানুষ, কষ্ট হলেও এইখানে বসে থাকব। নূর হোসেন হত্যারও বিচার হয় নাই। সেই বিচারও আমি চাই। রাঙ্গা তো মন্ত্রী ছিল, সে কোন জ্ঞানে এমন কথা বলল?’
গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে জাপা মহাসচিব শহীদ নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর বলে উল্লেখ করেন। এদিন বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র দিবস’-এর আলোচনা সভায় রাঙ্গা বলেন, ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর ছিলেন নূর হোসেন। তাকে নিয়ে নাচানাচি করছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি। তাদের কাছে ইয়াবা-ফেনসিডিলখোর ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব বেশি। এরশাদ সাহেবের কাছে এরা কোনো গুরুত্ব পায়নি। যারা গণতন্ত্রের ‘গ’ও বুঝে না, অ্যাডিক্টেড একটি ছেলে নূর হোসেন। পুলিশ গুলি করল সামনে থেকে আর ঘুরে গিয়ে পেছন থেকে লাগল। কী হাস্যকর যুক্তি। তার দাবি, নূর হোসেনের হত্যার ঘটনায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বা তার সরকার দায়ী ছিল না। যে ধরনের গুলিতে নূর হোসেন মারা গেছেন, সে ধরনের গুলি তখন পুলিশ ব্যবহার করত না।
রাঙ্গার এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শহীদ নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যরা। তার বড় ভাই আলী হোসেন বলেন, ‘৩৩ বছর ধরে নূর হোসেনকে সম্মান দিচ্ছে এই জাতি। তাকে গণতন্ত্রের প্রতীক বলে জনগণ। শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে গণতন্ত্র দিবসও পালন করা হয়। সে গণতন্ত্রের জন্য মারা গেল। এখন তারই সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথা বলা হচ্ছে, এটা কেমন কথা? আমাদের রাস্তায় নামতে হলো কেন? গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা মারা গেছে তাদের অবমাননা হলো। শহীদ পরিবারের অবমাননা হলো। নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের জন্য স্বৈরাচার এরশাদ সংসদে বসে মাফ চেয়েছিল, আমার বাবার কাছে মাফ চেয়েছিল। জনগণের কাছে আমাদের দাবি, এই লোকের (রাঙ্গা) বিচার হোক। এই লোকের নাম মুখে নিতেও কষ্ট হচ্ছে। তখন কি ফেনসিডিলের ব্যবহার ছিল, ইয়াবার ব্যবহার ছিল?’
প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ সেøাগান ধারণ করে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর পুরোভাগে থাকা নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তার তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ডাকসুর : শহীদ নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বলায় জাপা মহাসচিব রাঙ্গাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডাকসু। রাঙ্গার দেওয়া বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে গতকাল ডাকসুর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের উপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গা শহীদ নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর বলে যে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একজন শহীদকে যেভাবে অপমান ও অশ্রদ্ধা করেছেন, ডাকসু তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। একই সঙ্গে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে তার এই বক্তব্য প্রত্যাহার ও জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করা গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।’
