মিরপুরে শিশু গৃহকর্মী খাদিজাকে নির্যাতন

দায়িত্ব বুঝে নিয়েও মানবাধিকার কমিশন ঘুমাচ্ছে : হাইকোর্ট

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:২০ এএম

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পরও কমিশন জেনেশুনে ঘুমাচ্ছে। কমিশনের অনেক আইনি ক্ষমতা থাকলেও তারা তা প্রতিপালন করছে না। রাজধানীর মিরপুরের শিশু গৃহকর্মী খাদিজাকে গৃহকর্তা কর্তৃক নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকার চেয়ে করা রিট আবেদনের রায়ে গতকাল সোমবার এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আদালত গৃহকর্মী খাদিজার নির্যাতনের বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনকে ৬০ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছে, এ বিষয়ে খাদিজা ও তার পরিবারের বক্তব্য শুনে তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার

অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশনের ১৯ ধারা অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে সুপারিশ করতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ইঙ্গিত করে হাইকোর্ট বলে, কোনো মানুষ যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তাকে ডেকে তোলা যায়। কিন্তু কেউ যদি জেগে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তাকে ডেকেও তোলা যায় না। কমিশনকে মনে রাখতে হবে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কমিশন যখন হস্তক্ষেপ বা শুনানি করে তখন কমিশন আধা বিচারিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। তাই তাদের ন্যায়বিচার ও আইনের বিধিবিধান প্রতিপালন করতে হবে। 

হাইকোর্ট জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে কমিশন যে খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে তা সুশীল সমাজের সঙ্গে পরামর্শ করে যথাযথ সময়ে সম্পন্ন করা, কমিশনের আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ, কমিশনের কোনো সুপারিশ সরকার অগ্রাহ্য করলে কমিশন আইনের ১৯ ধারা এবং সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঘটনা হাইকোর্টের নজরে আনা। 

২০১৩ সালে মিরপুরে ১২ বছরের শিশু খাদিজাকে নির্যাতনের ঘটনায় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেছিলেন চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (সিসিবি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম এ হালিম। আদালতে তিনি নিজেই শুনানি করেন। এর আগে এ ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে চিঠি পাঠায় সংগঠনটি। পাঁচ বছর পার হওয়ার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় হাইকোর্টের দারস্থ হয় সংগঠনটি। রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গত ৯ জানুয়ারি রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গতকাল এ রায় ও পর্যবেক্ষণ এলো।

সাগর-রুনি হত্যা মামলা কি চাঞ্চল্যকর হিসেবেই থেকে যাবে : সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তের ধীরগতিতে হতাশা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, কতদিন আর এভাবে চলবে? এটি কি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবেই তালিকায় থেকে যাবে? গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এ মন্তব্য আসে।

চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তের সবশেষ অবস্থা জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তলব করেছিল আদালত। হত্যাকা-ের সন্দেহভাজন আসামি তানভীর রহমানের মামলা বাতিলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ অক্টোবর শুনানিকালে ওই তলবের আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।

আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার শফিকুল আলম মামলার সব নথিপত্র নিয়ে হাইকোর্টে হাজির হন। তার বক্তব্য শুনে এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) দিন ধার্য করে আদালত। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী। তানভীরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফওজিয়া করিম ফিরোজ।

তদন্ত কবে শেষ হবেÑ হাইকোর্টের এমন প্রশ্নে তদন্তকারী কর্মকর্তা শফিকুল আলম জানান, এখন পর্যন্ত এফবিআই থেকে চারটি ডিএনএ টেস্টের মধ্যে দুটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও নমুনার সঙ্গে আসামিদের নমুনা মেলেনি। আর অন্য দুটি নমুনার প্রতিবেদন এলে ডিএনএ’র বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী খুনিদের কল্পিত চেহারা অঙ্কনের চেষ্টা করা হবে।

হাইকোর্ট এ সময় প্রশ্ন রেখে বলে, ডিএনএ টেস্টের ওপর এ মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কি না। একই সঙ্গে কবে এই প্রতিবেদন আসবে তা জানতে চায় আদালত। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আসামি তানভীরের আদালতে হাজিরা দেওয়া নিয়ে হাইকোর্ট বলে, ‘একটা লোক গত সাত বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিচ্ছে। কবে তদন্ত শেষ হবে। কতদিন এভাবে চলবে?’ এ অবস্থায় তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, তিনি গত ৪ জুলাই তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে আরও ছয়জন তদন্তের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে দ্রুত তদন্ত শেষ হবে বলে আদালতকে আশ^স্ত করেন তিনি। আদালত বলে, ‘ক্লু না থাকলে এ তদন্ত দিয়ে কী হবে? গত আট বছরে কিছু হয়নি। এটি কি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবেই তালিকায় থেকে যাবে?’

আদালত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চায়, ঘটনার সময় যে ল্যাপটপ খোয়া গিয়েছিল সেটি উদ্ধার করা গেছে কি না? জবাবে তিনি জানান, সেটি উদ্ধার করা যায়নি। এছাড়া বাসায় ব্যবহার্য ছুরি, বঁটিসহ মোট ২৩টি আলামত জব্দ করা হয়েছিল বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছারাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এ ঘটনায় মামলার পর প্রথম তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার একজন উপপরিদর্শক। এরপর মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। তারপর তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে এ পর্যন্ত ৬৮ বার সময় নেওয়া হয়েছে বিচারিক আদালত থেকে। ১৪ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী তারিখ রয়েছে।

এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ভবনের নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। আরেক নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত আছেন। সাগর-রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান গ্রেপ্তার হন ২০১২ সালের ১ অক্টোবর। ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি জামিন পান।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত