পরীক্ষা নয় শিশুশিক্ষা হোক সৃজনশীলতা চর্চার

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৪১ এএম

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার উদ্দেশ্য শিশুর মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক জ্ঞানের বিষয়গুলোতে হাতেখড়ি দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ-প্রকৃতি-সমাজ-সংস্কৃতির প্রাথমিক পাঠ দেওয়া হয়। কেবল শ্রেণিকক্ষ আর পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয় এই পাঠদানের প্রক্রিয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এজন্য নানা সহশিক্ষা কার্যক্রম থাকে। এভাবে চারপাশের জীবন ও জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শিশুদের জানার কৌতূহলকে আরও উসকে দেবেন শিক্ষকরা। তারপর নিবিড় পরিচর্যার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ আগ্রহের বিষয়ের চর্চায় শিশুদের আরও উৎসাহিত করা হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়, শিশুদের মানবিক আচরণ ও নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে। আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষা এমনই হওয়ার কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের নীতিই অনুসরণ করা হয়। এ কারণে বহু দেশেই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় কোনো পরীক্ষা পদ্ধতিই নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এখনো অনেকটাই ভিন্ন।

সম্প্রতি এক অনাকাি•ক্ষত ঘটনার সূত্র ধরে দেশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় পরীক্ষা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিতর্কটি আবারও সামনে এসেছে। গত ১৯ নভেম্বর দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘পিইসি পরীক্ষায় শিশু বহিষ্কার কেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ নভেম্বর শুরু হওয়া প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ‘অসাধু পন্থা’ অবলম্বন করার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৫ শিশুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের বিষয়ে নির্দেশনাও রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। তবে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষক এমনকি অভিভাবকরা বলছেন, কোমলমতি শিশুদের এ ধরনের বহিষ্কার তাদের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। কর্তব্যরত শিক্ষকরা আরও সচেতন হলে এ ধরনের বহিষ্কার এড়ানো যেত। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এএম জামিউল হক দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে একটি রুল জারি করে উচ্চ আদালত।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত এক আদেশে পিইসি পরীক্ষায় শিশুদের বহিষ্কার কেন অবৈধ নয়– তা জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি বহিষ্কার হওয়া শিশুদের পুনরায় পরীক্ষা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চেয়েছে আদালত। একই সঙ্গে শৃঙ্খলাভঙ্গ সংক্রান্ত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর জারি করা নির্দেশনার ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ কেন অবৈধ হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত ১০ ডিসেম্বর পরবর্তী আদেশের তারিখ ধার্য করেছে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী বা ‘পিইসি’ পরীক্ষাটিই জাতীয় শিক্ষানীতিতে নেই। তারপরও এ পরীক্ষাটি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তারা ১১-১২ বছর বয়সের শিশু। সহশিক্ষা কার্যক্রম ও সৃজনশীল পাঠদানের চর্চায় জোর না দিয়ে মুখস্থবিদ্যা নির্ভর পাঠদান ও পরীক্ষার পদ্ধতি চাপিয়ে দিয়ে শিশুদের এসব পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। তার ওপর পরীক্ষায় ‘নকল করার’ অপরাধে তাদের পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এ বয়সের শিশুদের আদতে ‘পরীক্ষা’ বা ‘নকল’ বিষয়টিই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারার কথা নয়। বরং শিশুদের দণ্ড দেওয়ার পরিবর্তে এই প্রশ্ন ওঠা জরুরি ছিল যে, শিশুরা কী করে ‘নকল করা’ বা ওই রকম বিকৃতির শিকার হলো। আর যদি কোনো শিশু এমনটা করেই থাকে, তাহলে শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ‘বহিষ্কার’ না করে অন্য কোনোভাবে শিশুদের নকল করা থেকে বিরত রাখা যেত। এই শিশুদের জীবন থেকে শিক্ষাজীবনের একটি বছর হারিয়ে যেত না। এমন বহিষ্কারের ঘটনায় শিশুরা ট্রমাটাইজড হয়ে যেতে পারে।

উচ্চ আদালত ‘পিইসি’ পরীক্ষায় বহিষ্কার সংক্রান্ত দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে রুল জারি করায় আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দেশের প্রবীণ অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও শিশু মনোবিদরা। অনেকেই শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় এ পরীক্ষাটি বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন– বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ, এ সনদে স্পষ্ট বলা আছে শিশুদের ওপর মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন হয়– এমন কিছু করা যাবে না। মনোবিদরা বলছেন, পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় গুরুত্ব না দিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশ, শারীরিক শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে প্রাথমিক শিক্ষায়। মনোবিশেস্নষকদের মতে, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ শিশুমনে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে এবং শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ করে নানারকম মনোবৈকল্য ঘটাতে পারে। এ অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ নীতিনির্ধারকরা জাতীয় শিক্ষানীতির যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, প্রাথমিক স্তর থেকে পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেওয়া এবং এ ধরনের অনাকাি•ক্ষত চর্চা দূর করতে ত্বরিৎ পদক্ষেপ নেবেন– সেটাই কাম্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত