পেঁয়াজ সংকট দূর করতে সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবির কার্যক্রম আরও বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সোমবারও দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে টিসিবির ট্রাকের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়েছে। এসব ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা প্রতিদিন ৪৫ টাকা দরে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারছেন। প্রতিটি ট্রাকে এক টন বা এক হাজার কেজি পেঁয়াজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পেঁয়াজ কিনতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। দাম নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত খোলাবাজারে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির।
ফেনীর শহীদ মিনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গতকাল টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়। কার্যক্রমের উদ্বোধনকরেন প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্রেতারা ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন। শুরুর দিনই সেখানে ক্রেতারা
ভিড় জমালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে লাইনে দাঁড় করিয়ে কার্যক্রম চালাতে সাহায্য করে।
বাগেরহাটে কোনো ধরনের প্রচার ছাড়াই গতকাল টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত এ ট্রাকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ কেনেন। তবে এর প্রভাব জেলার কোনো বাজারে পড়েনি। এখনো জেলায় প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ২২০-২৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে গতকাল শুরু হয়েছে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি। কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই ক্রেতারা লাইনে দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ কেনেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করেছে প্রশাসন। যশোরে গতকাল শুরু হয়েছে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি। প্রতিদিন এক টন করে তিন দিন এ কার্যক্রম চলবে। এই ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা দৈনিক এক কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা দরে কিনতে পারবেন। গতকাল জেলার খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ২২০ টাকা।
নড়াইলে গতকাল শুরু হয়েছে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এর উদ্বোধন করেন নড়াইল-২ আসনের সাংসদ ও বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। জেলায় মোট তিন টন পেঁয়াজ বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। মাগুরায়ও গতকাল টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এর উদ্বোধন করেন প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম। প্রতিদিন এক হাজার কেজি করে তিন দিন এ কার্যক্রম চলবে।
চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গতকাল টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সকাল ৯টা থেকে এসব ট্রাক থেকে বিক্রি শুরু হয়।
টিসিবির কার্যক্রমের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, দেশে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সারা দেশেই এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে ট্রাকের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
চট্টগ্রামে পাইকারিতে ফের বেড়েছে পেঁয়াজের দাম : বন্দরনগরী চট্টগ্রামে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছেই না, বাড়ছে পাইকারিতে। গতকাল সোমবার দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয় কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে ২০০-২১০ টাকা, যা গত রবিবার ছিল ১৮০ টাকা। আর মানে খারাপ দাগযুক্ত মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৫০ টাকা কেজি। এছাড়া প্রতি কেজি মিসরের পেঁয়াজ ১৫০, ভালো মানের লাল রঙের চীনের পেঁয়াজ ১২০ এবং সাদা রঙের চীনের পেঁয়াজ ৫০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়। এসব পেঁয়াজের পাইকারি দর রবিবার কেজিতে ২০-৩০ টাকা কম ছিল।
বাজারের গ্রামীণ বাণিজ্যালয়ের আড়তদার বলাই পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে জানান, আবারও সরবরাহ কমে গেছে। মিয়ানমার ও মিসরের পেঁয়াজ কম আসায় দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা। চীনের সাদা পেঁয়াজ ও মিয়ানমারের খারাপ মানের পেঁয়াজের দাম কম। তবে চাহিদা বেশি মিয়ানমারের পেঁয়াজের।
খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি ইদ্রিচ জানান, গতকাল সোমবার বাজারে ট্রাক এসেছে হাতেগোনা কয়েকটি। আড়তগুলোতে পেঁয়াজের সংকট আছে। পর্যাপ্ত পেঁয়াজ না এলে আবারও বাড়তে পারে দাম। কারণ দেশের সব ব্যবসায়ী খাতুনগঞ্জ থেকে পেঁয়াজ কিনতে ভিড় করছেন।
বক্সিরহাট খুচরা বাজারে গতকাল মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২৩০-২৫০ টাকা কেজি। প্রতি কেজি চীনের পেঁয়াজ বিক্রি হয় মানভেদে ৮০-১৩০ টাকা। আর মিসরের পেঁয়াজ ১৮০-২০০ টাকা। গত রবিবার এসব পেঁয়াজ একই দামে বিক্রি হয়। বিক্রেতা ইয়াকুব আলী বলেন, পাইকারির বাড়তি দাম কমতি দামের হিসাব খুচরায় চলে না। যখন যেই দামে কিনি সেই দামে বিক্রি। আমাদের দোকান, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ মিলেই দাম নির্ধারণ হয়। আড়ত থেকে দাম কমাচ্ছে না, পেঁয়াজের বস্তাও তেমন দিচ্ছে না। ক্রেতা মো. পারভেজ বলেন, পেঁয়াজ নিয়ে এই নাটক কবে শেষ হবে জানি না। এতকিছুর পরও সরকার দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা পকেট কাটছে আমাদের।
এদিকে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত দুদিনে ১ হাজার ৩৫৭ টন পেঁয়াজ আমদানি ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, গত সোমবার মিসর ও চীনের ৪৯৩ টন আমদানি করা পেঁয়াজের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চীনের ৩৪৮ ও মিসরের ১৪৫ টন। এছাড়া গত রবিবার ৮৬৪ টন পেঁয়াজের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সেখানে ছিল চীন থেকে আমদানি করা ৪৫৮ ও মিসরের ৪০৬ টন, যা সারা দেশের বাজারে চলে গেছে। তিনি বলেন, কৃষিজাত পণ্যের ঋণপত্র খোলার আগে আমদানির অনুমতি নিতে হয় উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে। তেমনি পণ্য আমদানির পর খালাসের আগেও আমাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়। তাই আমরা পণ্য পরীক্ষা করেই দ্রুতই পেঁয়াজের ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছি। যাতে বাজারে এ পণ্যের সংকট সৃষ্টি না হয়।
