স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর প্রকাশিত রাজাকারের প্রথম তালিকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তালিকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকায় এবং পরিচিত অনেক রাজাকারের নাম না থাকায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এ উদ্যোগ। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে হঠাৎ রাজাকারের এ তালিকা প্রকাশ এবং বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে প্রকাশ্যে। গতকাল মঙ্গলবার তালিকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল একে অন্যকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছেন। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, অভিযোগ বেশি এলে এ তালিকা প্রত্যাহার করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তালিকাটি প্রত্যাহারের বিষয়ে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসার নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান। প্রয়োজনে তালিকা প্রত্যাহার করে নতুন তালিকা করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম কীভাবে এলো এবং এর মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না–তাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।
গত রবিবার ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের তালিকার প্রথম অংশ প্রকাশ করা হয়। তালিকায় রয়েছে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নাম। সেদিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানান, চ‚ড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে আগামী বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে।
প্রকাশিত তালিকায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং পরিচিত অনেক রাজাকারের নাম না থাকায় দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ চলছে। এ তালিকা প্রণয়নের পদ্ধতি এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ তালিকা প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ও বিভিন্ন মহল থেকে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম’–এ নিয়ে দেশব্যাপী ড়্গোভ দেখা দেয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তালিকায় দেওয়া নোট সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নোট ফলো করা হয়নি বলেও আসাদুজ্জামান খান কামাল সরকারপ্রধানকে জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ তালিকাটি জেলা প্রশাসন থেকে যাচাই-বাছাই হয়নি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৯৭১ সালের একটি নথি পাঠিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সময় চাওয়া হয়েছে। কারণ ওই তালিকার অনেককে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আবার রেকর্ডরুমে পুরো তালিকা পাওয়া যায়নি। কাজেই এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো দায় নেই।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সহকারী সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করার পক্ষে ছিল মন্ত্রণালয়। কিন্তু মন্ত্রী ১৫ ডিসেম্বর তালিকা প্রকাশ করবেন এমনই প্রত্যয় থেকে তালিকা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ তালিকার বিপরীতে নাম ও আবেদন এলে সেটি যাচাই-বাছাই করে সংশোধন করা হবে।
১৫ ডিসেম্বর তালিকা প্রকাশের সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া রেকর্ডরুম ও নথি থেকে রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের তালিকা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শতভাগ নিশ্চিত হয়েই তালিকা করা হয়েছে। এরপর পুরো তালিকাটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ওয়েবসাইটে প্রকাশের কিছুক্ষণ পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জেলা থেকে বিক্ষোভ আসতে থাকে।
মোজাম্মেল হক তালিকা সম্পর্কে গতকালও দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে তালিকা পেয়েছি, তা-ই প্রকাশ করেছি। কোনো ধরনের সম্পাদনাও করিনি। তবে তিনি নথি থেকে নাম গায়েব হওয়া সম্পর্কে বলেন, বিএনপির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল। তারা খুবই চতুর। তাই জেলার রেকর্ডরুম থেকে অনেক ডকুমেন্টস সরিয়ে নিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেভাবেই হোক এসব তালিকা রেকর্ডরুম থেকে খুঁজে বের করতেই হবে। গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, রাজাকারের এ তালিকা আগে থেকেই করা ছিল। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী নাম প্রকাশ করেছি। এ তালিকা নিয়ে যদি ব্যাপক হারে অভিযোগ আসে, তাহলে আমরা তা প্রত্যাহার করে নেব।
মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী হত্যা করেছিল বরিশালের আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে। তার ছেলে আইনজীবী তপন কুমার চক্রবর্তী একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে তপন কুমারের নাম এসেছে। একই সঙ্গে আছে তার মা প্রয়াত ঊষা চক্রবর্তীর নামও। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, রাজাকারের এ তালিকা আগেই করা ছিল। তালিকাটি কোনো ধরনের এডিট ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা এখন তথ্য সংগ্রহ করছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তা যাচাই-বাছাই করব। তাছাড়া এ তালিকায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও নাম রাখা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।
মোজাম্মেল হক বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার নাম এ তালিকায় এলে আমি যেমন কষ্ট পেতাম, তেমনি যাদের নাম এসেছে, তারাও কষ্ট পেয়েছেন। আমি এ কারণে ব্যথিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো নোট ছাড়াই রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আমি আশা করব মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আরও নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করবে। গতকাল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কৃষক লীগ আয়োজিত সভায় তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রাজাকারদের যে তথ্য আছে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হয়েছিল। পরে পাঠানো হয়েছে। এটি একটি দুরূহ ব্যাপার। দালাল আইনে ১৯৭২ সালে যাদের নামে মামলা হয়েছিল, তদন্ত শুরু হয়েছিল, পরে আবার কেউ কেউ মামলা থেকে প্রত্যাহার হয়েছিল, তাদের আমরা প্রাথমিকভাবে নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে সেই মামলার বিবাদীদের নাম লিস্ট করি। পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিই। তবে সেই লিস্টে কিছু মন্তব্য করে দিয়েছি যে, অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এ হিসেবে আমরা আমাদের এখান থেকে একটি নোটও দিয়েছিলাম। সেই নোটে যাদের নামের মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল, তাদের লেখা হয়নি। ভুল করে হোক আর যেভাবে হোক এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমি মনে করি আরও যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আবার তালিকা প্রকাশ করবে।
এদিকে গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় ভুলভাবে যদি কারও নাম এসে থাকে, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে সেই নাম বাদ দেওয়া হবে। প্রকাশিত তালিকায় অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা যেভাবে পাওয়া গেছে, সেভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে–এ তালিকায় বেশকিছু নাম এসেছে, যারা রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শািন্ত কমিটির সদস্য বা স্বাধীনতাবিরোধী নন, বরং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন বা মুক্তিযোদ্ধা। এ ধরনের কোনো ব্যক্তির নাম তালিকায় কীভাবে এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
