ভারতে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৩৯ পিএম

যে গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে আমরা, মধ্যবিত্ত বাবু ভদ্দরলোকেরা গদগদ হয়ে যাই, সেই আমেরিকা ইংল্যান্ডেও কিন্তু ইদানীং রেসিজিম নিয়ে আইন খুব কড়া। আলটপকা মন্তব্য করলে আপনি যত কেউকেটা হোন না কেন শাস্তি হবে। পাকিস্তানের নাগরিকদের ‘পাকি’ বা আমেরিকান ব্ল্যাকদের ‘নিগার’ বলে দেখুন না একবার, বুঝবেন কত ধানে কত চাল। এদেশেও পাশ্চাত্যের অনুসরণে ‘এসটিএসসি’-দের অপমানজনক কথা বলে তার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি দেওয়ার আইন করা হয়েছে। অবশ্যই তা কাগজে কলমে। এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের শায়েস্তা করার অস্ত্র হিসেবে। আপনি প্রভাবশালী বিরোধী নেতা।  আপনার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা নেই।  অথচ আপনার কণ্ঠরোধ সরকারের স্বার্থে প্রয়োজন, তখন কোনো তফসিলি জাতি উপজাতি সমর্থককে দিয়ে ভুয়ো মামলা করে বিরোধী স্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রবণতাও বিজেপি আমলে বাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর পোশাকের সঙ্গে অপরাধীকে মিলিয়ে দেন তখন তা আর নিছক কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না। বৃহৎ এক আন্তর্জাতিক ‘রেসিজিম’ বা ‘বর্ণবাদ-সাম্প্রদায়িক’ প্রবণতার অংশ হয়ে যায়।

নাগরিক আইনে কী আছে বা নেই তা নিয়ে চাপানউতোর চলছে।  চলতে থাকুক।  কিন্তু ছাত্ররা আজ যে কারণে রাস্তায় নেমেছেন তা হচ্ছে এদেশের সরকারের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। দেশভাগের পর প্রতিবেশী দেশ যে নীতি নিয়েই চলুক, তা সমর্থনযোগ্য না হলেই এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি পাল্টিয়ে ফেলতে হবে, এমন যুক্তির মারপ্যাঁচ আমাদের বুড়ো খোকারা যতই বলুন; তরুণ প্রজন্ম ঠিকই আসল কথাটা বুঝতে পারছে, এটাই আশার কথা।

 

বাস্তবে নতুন সংশোধিত নাগরিক আইনে এত ফাঁকফোকর আছে তাতে কোনোদিনই এই আইন কোনো জনগোষ্ঠীরই সুবিধে দেবে না। খোদ গোয়েন্দা দপ্তরেরই রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, এই আইনে খুব বেশি ৩১,৩১৩ জন শরণার্থী থেকে ভারতীয় নাগরিক অধিকার পেতে পারেন। এদের মধ্যে ২৫,৪৪৭ জন হিন্দু, ৫,৮০৭ জন শিখ, খ্রিস্টান-৫৫, বৌদ্ধ-২জন আর পার্সি সম্প্রদায়ের ২জন। অথচ আমার দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও তার সমর্থক অনুচরেরা গলা ফাটিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছেনÑ ‘ক্যাআ’ (সিএএ) এমন এক যুগান্তকারী আইন তাতে নাকি লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হবেন। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা দপ্তর আর স্বয়ং মন্ত্রীর এই পরস্পরবিরোধী মন্তব্যে এটা পরিষ্কার যে গোটা বিষয়টি খুব স্বচ্ছ নয়।

এমনকি শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর গোয়েন্দা রিপোর্ট নয়, আসামের বিশিষ্ট বিজেপি নেতা সর্বানন্দ সোনোয়াল বারেবারে প্রকাশ্যে বলছেন এই আইনে খুব বেশি লোক নাগরিকত্ব পাবেন না। তাই যদি হয় তাহলে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশে এরকম ভয়ংকর বিভাজনের পথে যাওয়ার দরকার কী ছিল! কিংবা এখন সারা দেশে নতুন করে যে আগুন জ্বলছে তার দায় কার!

দেশের মডেল যদি ইসরায়েল হয়, তাহলে পরিষ্কার করে সরকার বলুক যে ‘বাংলাদেশের সব হিন্দু নাগরিক ভারতে চলে আসুন আমরা তাদের নাগরিকত্ব দেব। শিখ বৌদ্ধরাও আসতে পারেন।’ মূলত ধর্মীয় নির্যাতন যখন সরকারের মাথাব্যথা তখন এতসব কা--কারখানা ফলাও করার আগে প্রতিবেশী দেশের সরকারের সঙ্গে ‘অত্যাচারের’ বিস্তারিত তালিকা নিয়ে একবার কথা বলে নিলে হতো না? আর যাই হোক তারা তো আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র।  তাতেও যদি কাজ না হতো তখন আন্তর্জাতিক স্তরে ‘নির্যাতনের নথি’ পেশ করে ন্যায়বিচারের জন্য আর্জি জানানো যেত। নতুন আইনে ওপারে যদি সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বলে তখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আশা করি এদেশের হিন্দুত্ববাদী নেতাকর্মীরা নেবেন। দেশভাগের আগে কুমিল্লা, বরিশাল, নোয়াখালীর হিন্দু নেতারা অনেকেই চিঠি লিখে ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলেন তৎকালীন হিন্দু মহাসভার নেতা বাংলা ভাগের  মুখ্য কারিগর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। বলা বাহুল্য, শ্যামাপ্রসাদ বিষয়টি এড়িয়ে গেছিলেন। আগুন জ্বালানো যত সোজা তা নেভানো কিন্তু ততটাই কঠিন। বড্ড কঠিন।

‘সিএএ’ বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এ বলা হয়েছে আপনি প্রতিবেশী দেশ থেকে এসেছেন এবং ১৯২০-এ পাসপোর্ট আইনের সেকশন ৩ ধারা ২ এর সি ক্লজে ছাড় থাকলেই অর্থাৎ ভারতে ঢুকেছেন এই স্ট্যাম্পটুকুই যথেষ্ট নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য। আইনের মারপ্যাঁচে অনেক হিডেন বা লুকানো বিষয় থাকে তা খুব খুঁটিয়ে না দেখলে বিল বা আইনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিপদটা অনেক সময় আমরা খেয়াল করি না।

পাসপোর্ট আইনের সংশোধনী ১৯২০ সালের পরে আরও একবার ১৯৫০ সালে হয়েছিল। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে যে সংশোধনী পাসপোর্ট আইনে এসেছে তাতে স্পষ্ট যে ধর্মীয় অত্যাচার বা আতঙ্কে কেউ বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তা প্রমাণ করতে না পারলে কিন্তু নাগরিক হওয়ার আবেদন করা যাবে না। শুধু তাই নয় আপনি ওপারের কোথা থেকে কবে কেন এসেছিলেন তা ফর্মে পূরণ করার পরে তা খতিয়ে দেখবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইং। কোনোভাবে আবেদন যদি মিথ্যে প্রমাণিত হয় তাহলে জেল অবধি হতে পারে।

আর এই দেশের মুসলমান সম্পূর্ণ সুরক্ষিত বলে অনেক

তথাকথিত প্রগতিশীল বন্ধু যেভাবে প্রচার করে করে বিজেপির হাত শক্ত করছেন তারা সম্পূর্ণ মিথ্যে বলছেন। যাবতীয় বাগাড়ম্বরের পেছনে যে এদেশের শাসকদের ইসলামোফোবিক দৃষ্টিভঙ্গি তা বহুভাবে প্রমাণ করা যায়। পশ্চিমবঙ্গের বর্ণবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু বিদ্বেষ আজ এ রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পালে হাওয়া দিয়েছে।

রাজ্যে রাজ্যে এক একটা আলাদা আলাদা কারণে গণবিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আগেও বলেছি, আবারও বলব আলাদা কারণ আপাতচোখেই। কিন্তু সব ইস্যু আদতে অর্থনীতি।

আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী জনজাতির আশঙ্কা সংখ্যালঘু হয়ে জমি হারানোর। পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর জনগণের ক্ষোভ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে তোলার কারণে। সারা ভারতের যন্ত্রণাÑদেশ ক্রমেই স্বৈরতান্ত্রিক পথে চলে যাচ্ছে বলে। পেছনে কিন্তু নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির করুণ অবস্থাই সবরকম ক্ষোভের পেছনে অনুঘটকের কাজ করছে। আমাদের ছাত্ররা তাই সঠিক উচ্চারণে পথে নেমেছে। আওয়াজ তুলেছে ধর্ম যার যার। তার দোহাই দিয়ে একের পর এক ইনস্টিটিউশনের ফি বৃদ্ধি চলবে না। একের পর এক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। চাকরি না দিলে সরকার তুমি গদি ছাড়ো। ফলে এবারের আন্দোলন নিছক ‘ক্যাব’ বা ‘এনআরসি’ বিরোধিতা নয়। এ লড়াই দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বাঁচানোর লড়াই। এ এক রাজনৈতিক যুদ্ধ। গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্রের।

এ লড়াইয়ে সবচেয়ে বর্ণময় দেশের তরুণ প্রজন্ম। গানে-গানে, কবিতায়-ছবিতে, দৃপ্ত সেøাগানে ভারতের অন্ধকার আকাশে নতুন রঙধনু যেন রং ছড়াচ্ছে।

লেখক : ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত