নদী মুক্তির পথ খুলুক নতুন বছরে

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৪২ এএম

দেশের নদ-নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে ২০১৯ সাল খুবই উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে। বিশেষত, এ বছর তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’, ‘আইনি ব্যক্তি’ ও ‘আইনি সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা। এ রায়ের ফলে দেশের সব নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয়ও পরস্পর সম্পৃক্ত বা একীভূত সত্তা হিসেবে একই সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা পেল। একই সঙ্গে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়, পাহাড়, সমুদ্র ও সৈকত-বেলাভূমি এবং বনাঞ্চলকে দেশের জনগণের সম্মিলিত সম্পত্তি বা ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ হিসেবে দেখাশোনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের বলেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদীর অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। নদ-নদী তথা পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় এ রায় যেমন একটি আইনগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে এর আদর্শিক তাৎপর্যও ব্যাপক।

উচ্চ আদালতের রায়ের সূত্র ধরে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবার বাস্তবিক অর্থেই একটা শক্তিশালী কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে সক্রিয় হতে পারবে। কিন্তু কমিশনের বর্তমান আইন সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের জটিলতা নিরসন না হওয়ায় এ কাজে আশানুরূপ গতি এখনো আসেনি। অবশ্য এর মধ্যেও বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল-জলাশয় দখল ও দূষণমুক্ত করতে কমিশন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী দখলমুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান উল্লেখযোগ্য। এ অবস্থায় শনিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে নিজস্ব দপ্তরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে সারা দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধভাবে দখল করে রাখা ৪৯ হাজার ১৬২ জন দখলদারের তালিকা তৈরি করে কমিশন দখলদারদের উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছে। বছরান্তে কমিশনের এ ঘোষণা নিঃসন্দেহে খুবই আশাব্যঞ্জক।

কমিশন বলছে, এক বছরের মধ্যেই এদের উচ্ছেদের জন্য তালিকাসহ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। তালিকার বাইরে কেউ থাকলে দ্বিতীয় তালিকার মাধ্যমে তাদেরও উচ্ছেদ করা হবে। দ্বিতীয় তালিকা তৈরির জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নদী রক্ষা আইন সংস্কার ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা। সংবাদ সম্মেলনে কমিশন চেয়ারম্যানের একটি বক্তব্য বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি বলেছেন, প্রভাবশালীদের দখল উচ্ছেদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়লেও স্থানীয়ভাবে আইন প্রয়োগকারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে প্রভাবশালীরা। বিশেষ করে, জেলা প্রশাসনগুলো নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে খুব একটা আগ্রহী নয়। কমিশনের এ উদ্বেগ প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতের রায়ের কথা মাথায় রাখা দরকার। রায়ে স্পারসোর স্যাটেলাইট সার্ভের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ এবং সে সংক্রান্ত ডিজিটাল ডেটাবেজ জেলা-উপজেলা-পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রায়ের এ নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি কেন? নদী-জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণের কাজ বাস্তবায়িত হলে অবৈধ দখলমুক্ত করার কাজে জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নানা সংস্থা ও দপ্তরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সহজ হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, আগে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ৮০০ বলা হলেও এখন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০৫টি নদীর, এর মধ্যে বেশিরভাগেরই অবস্থা মরণাপন্ন। দূষণ, দখল, ভাঙন ও নদী ভরাট সব মিলিয়ে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে নদীগুলো। কমিশনের এ বক্তব্যের সঙ্গে নদী-জলাশয় দখলমুক্ত করা সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখলে সামগ্রিক বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের উচ্চ আদালতে নদীর সীমানা নিয়ে বিরোধ, নদীদূষণ, নদী দখল, নদী ভরাটসহ নানা বিষয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মামলা ঝুলে আছে। অন্যদিকে নানা সময়ে দেশের আদালতগুলোতে নদীর সুরক্ষা নিয়ে অনেক রায় ঘোষণা সত্ত্বেও সেসবের বাস্তবায়ন ঝুলে গেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় নদী রক্ষা আইনের যুগোপযোগী সংস্কার এবং নদী রক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলাগুলো নিরসন করতে হবে। একই সঙ্গে নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয়ের প্রাকৃতিক প্রবাহ ও বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হলে এ নিয়ে বিশদ ভৌগোলিক সমীক্ষা পরিচালনা করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এজন্য বন্যা, নদীভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বহুল আলোচিত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’-এর সঙ্গে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমন্বয় করে সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করাও জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত