২০১৮ সাল থেকেই পুঁজিবাজারে টানা দরপতন চলছে। এ সময়ে বাজারে প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক পতনে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়েছেন। যদিও বিশ্বের অন্য দেশগুলোর পুঁজিবাজার রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী ধারায়। দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ মাসুদ
দেশ রূপান্তর : দুই বছর ধরে টানা দরপতন চলছে পুঁজিবাজারে। এ সময় বিশ্বের অন্যান্য পুঁজিবাজার রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী ধারায়। দেশের বাজার পরিস্থিতি উল্টো পথে হাঁটার কারণ কী?
মিজানুর রহমান : আমাদের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা ও দৈনিক লেনদেন এমন পর্যায়ে গেছে যে, এটা এখন মৃতপ্রায়। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্টক এক্সচেঞ্জসহ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং বাজার উন্নয়নে তাদের কার্যকর ভূমিকা না থাকা। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা কোনো সুরক্ষা পায় না। আইপিওতে যেসব কোম্পানি এসেছে, এর একটি বড় অংশই কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় চলে গেছে। তাদের শেয়ারের দামও অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে গেছে। প্রাইমারি মার্কেটের বিনিয়োগকারীরাও পুঁজি হারিয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দরপতনের জন্য দায়ী। দেশে গত তিন-চার বছরে চলতি হিসাবে ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট) অনেক বেড়েছে। এই ঘাটতি সৃষ্টি হলে বিদেশ থেকে ঋণ অথবা রিজার্ভ বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা পূরণ করতে হয়। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ সেল করে চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণে অর্থায়ন করেছে। যখন ঘাটতি অর্থায়ন করা হয়, তখন মুদ্রাবাজারে টাকার সরবরাহ হ্রাস পায়। আর টাকার সরবরাহ হ্রাস পাওয়া মানে হচ্ছে তারল্য সংকট সৃষ্টি হওয়া। তারল্য সংকট যখন মুদ্রাবাজারে সৃষ্টি হয়, তখন তার প্রাথমিক প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে। পুঁজিবাজার থেকে তারল্য প্রত্যাহার হবে এবং সেখানে দরপতন হবে। গত দুই বছর ধরে যে ব্যাপক দরপতন হয়েছে, তার মৌলিক কারণ হচ্ছে আমাদের চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং ডলার বিক্রির মাধ্যমে মুদ্রাবাজার থেকে তারল্য প্রত্যাহার।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, চলতি হিসাবে ঘাটতি কেন হয়? মূলত সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঞ্চয়হীনতা চলতি হিসাবে ঘাটতি সৃষ্টি করছে। বেসরকারি খাতের ধার নেওয়ার প্রবণতা ট্র্যাডিশনাল। কিন্তু সরকারের ধার গ্রহণের প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে বেড়েছে। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে সরকার অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সরকারের রেভিনিউ বাড়ছে না। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, যা চলতি হিসাবের ঘাটতিও বাড়িয়ে তুলেছে। এখন সামষ্টিক অর্থনীতির যে কারণটা রয়েছে, তা কমপ্লিকেটেড। এটা যদি আমরা অ্যাড্রেস করতে চাই তাহলে আমাদের মুদ্রাবাজার ও ফরেক্স মার্কেটে সংস্কার আনতে হবে। এজন্য আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। এটা হলে আমাদের রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়বে, আমদানি কমবে। এতে করে আমাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি কমবে এবং তাতে করে মুদ্রাবাজারে যে তারল্য সংকট সেখানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দেশ রূপান্তর : গত দুই বছর ধরে বিদেশিরাও শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে। বিদেশিরা এমন কেন করছেন?
মিজানুর রহমান : বিদেশিরা যখন দেখে অর্থনীতিতে সংকটের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন তারা ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য বিনিয়োগ যেকোনো মূল্যে লিকুইডেট করে চলে যাবে।
দেশ রূপান্তর : বিদেশিদের এই বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘গ্রামীণফোন ইস্যু’ কি কোনো প্রভাব রাখছে?
মিজানুর রহমান : বিটিআরসির সঙ্গে সংঘাত গ্রামীণফোনের বিনিয়োগকারীদের সাংঘাতিকভাবে হতাশ করেছে। কারণ গ্রামীণফোন একটি বিদেশি, হাইটেক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন মেনে চলা কোম্পানি। এ কোম্পানিতে অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেছেন, তাদের ভ্যালু মেইনটেন করার জন্য। এখন বিটিআরসি গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার কোটি টাকার পাওনা দাবি করছে, তাতে কোম্পানিটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই টাকা যদি গ্রামীণফোনকে দিতে হয়, তাহলে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পাবে। এ কারণে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দর কমেছে, বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর গ্রামীণফোন যেহেতু বাজারের সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি, তাই এর শেয়ার দরের ওঠানামা বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
দেশ রূপান্তর : এক যুগেরও বেশি সময়ে সরকার বারবার ঘোষণা দিয়েও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনতে পারেনি। এরই মধ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি কীভাবে আনা যায়?
মিজানুর রহমান : সরকারি কোম্পানিগুলো আনতে না পারার নেপথ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাজ করেছে। সরকারি কোম্পানির পর্ষদে আমলারা পরিচালক হিসেবে থাকেন। তারা কোম্পানি থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। যদি সরকারি কোম্পানির বেশিরভাগ শেয়ার বাজারে ছাড়া হয়, তাহলে কোম্পানির পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক আসবে, তারা ব্যবস্থাপনায় নজরদারি চালাবেন। কিন্তু আমলারা এটি চান না। তারা ওই সুবিধাগুলো আঁকড়ে থাকতে চান। সরকারি কোম্পানিগুলো বাজারে না আনতে পারার এটাই মূল কারণ।
আর বেসরকারি খাতের ভালো কোম্পানি আনতে চাইলে তাদের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে। তাদের স্বচ্ছতার সুযোগ দিতে হবে, দ্রুত তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু আমাদের এখানে কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে অনেক বেশি সময় নেওয়া হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালন করা কোনো কোম্পানি আন্ডার ভ্যালুতে আসতে চাইবে না। আবার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় যদি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তারা আসবে না। কারণ একটি ভালো কোম্পানি যাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে, মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, তারা কোনো অন্যায়ের সহযোগী হবে না। কম দরেও শেয়ার বিক্রি করবে না।
গত ১০ বছরে পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানি অভিহিত মূল্য ও প্রিমিয়ামে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই অতিরিক্ত মূল্যে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অভিহিত মূল্যে আসা কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির আগে পরিশোধিত মূলধন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এতে অনেক কোম্পানিই অভিহিত মূল্যের নামে অতিমূল্যায়িত হয়ে পুঁজিবাজারে এসেছে। ওইসব কোম্পানির অভিহিত মূল্যে আসার যোগ্যতাও ছিল না। আবার প্রিমিয়ামে কোনো কোনো কোম্পানি এসেছে, যারা সর্বোচ্চ ১০ টাকা প্রিমিয়াম পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু তাদের ৩০ টাকা দেওয়া হয়েছে। এভাবেই অধিকাংশ কোম্পানি অতি মূল্যায়িত হয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অথচ গত ১০ বছরে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই তালিকাভুক্ত সময়কালীন যে আয় দেখিয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ধরে রাখতে পারেনি। ফলে শেয়ার দর কমে গেছে, বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার কিনে সর্বস্বান্ত হয়ে বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। এ কারণেই বাজারের আজ এই দুরবস্থা তৈরি হয়েছে।
স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তারা ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে পারেনি। আবার জাঙ্ক শেয়ার তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করেছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইপিও অনুমোদনে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি। ভালো কোম্পানিগুলোর চাহিদা হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্যমূল্য, যা আমাদের স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি।
দেশ রূপান্তর : পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা দূর করতে এখন করণীয় কী?
মিজানুর রহমান : সমস্যার মধ্যেই সমাধান নিহিত রয়েছে। প্রথমে স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পর্ষদ থেকে পৃথক করা প্রয়োজন। যদিও স্টক এক্সচেঞ্জ বিন্যস্তকরণের ফলে মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদাহরণ এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও স্বাধীন পরিচালক পদে সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যক্তিকে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যারা বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষায় কাজ করবেন, সুশাসন ফিরিয়ে আনবেন এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখবেন। করপোরেট গভর্ন্যান্স ও তালিকাভুক্তির বিধিমালা প্রয়োগ করবেন। বাজারে নতুন নতুন প্রডাক্ট আনবেন।
কিন্তু স্বাধীন পরিচালকদের নামে আমরা যদি অপ্রাসঙ্গিক লোকদের বসাই, তাহলে স্টক এক্সচেঞ্জ কার্যত ব্যর্থ হবে। অতীতে এমনটিই হয়েছে। স্বাধীন পরিচালক হিসেবে সেখানে যাদের নেওয়া হচ্ছে, তারা স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারছে না। মূলত শেয়ারহোল্ডার পরিচালকরাই এক্সচেঞ্জ চালাচ্ছেন। তাই এসব পদে যোগ্যতাসম্পন্ন সক্ষম ও সৎ লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। এজন্য স্টক এক্সচেঞ্জের বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
একইভাবে আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আশা করি। এসইসি হচ্ছে এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রক। তারাই কিন্তু সিকিউরিটিজ রেগুলেশন প্রয়োগ করে থাকে। তারা যদি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় কোম্পানির শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য, করপোরেট গভর্ন্যান্স ইত্যাদি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে এই বাজারের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমরা স্টক এক্সচেঞ্জ ও এসইসির পরিচালনগত সক্ষমতায় ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার আশা করি। এসইসির ব্যাপক স্বাধীনতা ও সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে। যাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ওপর করপোরেট গভর্ন্যান্সে মনিটরিং করতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পরিপালনের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজিসহ যেকোনো ধরনের অপরাধে যথাযথ শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মিজানুর রহমান : দেশ রূপান্তরকেও অনেক ধন্যবাদ।
