গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় দেওয়া আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের (আইসিজে) অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এর ফলে অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আইসিসির কৌঁসুলি ফেতু বেনসুদার জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফাকিসো মোকোচোকো ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। ফাকিসো মোকোচোকো বলেন, ‘আমরা এখন বলতে পারব যে, অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মিয়ানমার নিজেই অপরাধের বিষয়টি স্বীকার করেছে। এখন আমাদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে কে অপরাধ করেছে, কে অপরাধ করতে সহায়তা করেছে? আমরা প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছি, যাতে নির্দিষ্টভাবে বলতে পারি কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা অপরাধ করেছে।’
তিনি বলেন, আইসিজেতে মিয়ানমার বলেছে, কিছু জেনারেল ও অন্যরা হয়তো অপরাধ করেছে এবং তাদের বিচার করা হবে। আইসিসি যদি এ বিষয়ে কোনো তথ্য পায়, তবে সেটি তারা বিবেচনায় নেবে বলে জানান তিনি।
আইসিসির কৌঁসুলির এই পরামর্শক জানান, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে আইসিসি। গত নভেম্বর থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে যতদিন যথেষ্ট নিশ্চিত প্রমাণ সংগ্রহ না করা হচ্ছে ততদিন এ তদন্ত চলবে।
তিনি বলেন, ‘এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন হবে। তদন্তকারীরা বাংলাদেশে আসবে, ক্যাম্পে যাবে, ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলবে, সাক্ষীদের প্রস্তুত করবে এবং তাদের সঙ্গে কী হয়েছিল, তা খুঁজে বের করবে। আমরা আশা করি এর শেষ পরিণতি হবে রোহিঙ্গাদের জন্য বিচার নিশ্চিত করা।’
কী ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রমাণ সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলা, ডকুমেন্ট ও ফুটেজসহ নানা ধরনের প্রমাণ। এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি আইসিসি কৌঁসুলি। তখনই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে, যখন তার বিরুদ্ধে জোরালো প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।’
তদন্ত প্রক্রিয়া গোপনীয়ভাবে করা হবে জানিয়ে ফাকিসো মোকোচোকো বলেন, ‘কেউ যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তবে আমরা অনুরোধ করব যোগাযোগের বিষয়টি যেন ওই ব্যক্তি গোপন রাখেন। যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। কেউ যদি হুমকির সম্মুখীন হন, তবে সঙ্গে সঙ্গে যেন ওই ব্যক্তি কৌঁসুলি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’ সাক্ষীকে হুমকি বা ঘুষ দেওয়া বা তাকে সত্যি কথা বলতে বাধা দেওয়া অপরাধ এবং এর তদন্ত ও বিচার হবেও বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের প্রশংসা করে আইসিসির কৌঁসুলি অফিসের ডিরেক্টর বলেন, ‘সরকার তদন্তে ও প্রমাণ সংগ্রহে সহযোগিতা করছে। তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সহায়তা করবে।’
মিয়ানমারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু তারা কোনো উত্তর দেয়নি। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। তবে যেটাই হোক, মিয়ানমারের সহযোগিতাসহ বা ছাড়াই এই তদন্ত সম্পন্ন হবে।’
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে এই তদন্তের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা বাংলাদেশ সরকারকে পরিষ্কারভাবে বলেছি, তারা তাদের মতো করে প্রত্যাবাসনের জন্য আলোচনা অব্যাহত রাখুক এবং প্রত্যাবাসন হোক বা না হোক, এই তদন্ত চলতে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটি লম্বা প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তার সুবিচার নিশ্চিত করা।’
