সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় র্যাবের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর কোনো আদেশ দেয়নি হাইকোর্ট। একই সঙ্গে শুনানি গ্রহণের বিষয়ে এখতিয়ার নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন তোলায় এ মামলায় সন্দেহভাজন মো. তানভীর রহমানের ক্ষেত্রে মামলা বাতিল চেয়ে করা আবেদন কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছে আদালত। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ আদেশ দেয়।
হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সাগর-রুনি হত্যা মামলায় তদন্তের সবশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন ও তানভীর রহমানের সম্পৃক্ততা প্রশ্নে র্যাবের প্রতিবেদন গতকাল আদালতে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর ও রুনির টি-শার্ট থেকে প্রাপ্ত নমুনা পরীক্ষণে প্রতীয়মান হয় এ হত্যাকাণ্ডে কমপক্ষে দুজন অপরিচিত পুরুষ জড়িত ছিল। এই অপরিচিত অপরাধী শনাক্ত কল্পে ডিএনএ প্রস্তুতকারী যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ল্যাব কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ডিএনএর মাধ্যমে অপরাধীর ছবি বা অবয়ব প্রস্তুতের চেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে তানভীরের সম্পৃক্ততা প্রশ্নে বলা হয়, আসামি তানভীর রহমানের ঘটনার পূর্ব ও পরবর্তী আচরণ খুবই সন্দেহজনক। তিনি এই মামলার ঘটনায় জড়িত নন, এই কথা এ পর্যায়ে বলা যুক্তিযুক্ত হবে না। এ সময় তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপনের আগেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘সাংবাদিকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা তো সংবাদের পেছনে ছুটবেই। কিন্তু আদালতে প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের আগেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো কীভাবে? নিশ্চয়ই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে এটি সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছেছে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এই মামলায় শুনানি গ্রহণ এবং আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার এই বেঞ্চের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বলেন, গত ১৪ নভেম্বর যখন এ-সংক্রান্ত আদেশ দেওয়া হয়েছিল তখন এই বেঞ্চে ফৌজদারি মামলার বিচার হতো। চলতি সময়ে এই বেঞ্চের শুনানির এখতিয়ার রিট আবেদনের। তানভীরের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ সংশ্লিষ্ট বিধি উল্লেখ করে জানান, মামলাটির শুনানি গ্রহণ ও আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ আদালতের এখতিয়ার রয়েছে।
এ পর্যায়ে বেঞ্চের দুই বিচারক কিছু সময় নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে মামলটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আদেশ দেন। আদেশে হাইকোর্ট বলে, ‘গত ১৪ নভেম্বর মামলাটির সর্বশেষ অবস্থা ও এই মামলায় তানভীর রহমানের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে জানানোর আদেশ ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদেশ প্রতিপালনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার শুনানির শুরুতে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আমরা আমাদের এখতিয়ার সম্পর্কে অবহিত।’ আদালত আরও বলে, ‘যেহেতু অত্র রুলটি চলমান, সেহেতু আমাদের বিবেচনায় এই মামলার শুনানিতে আমাদের এখতিয়ারগত কোনো বাধা নেই। তারপরও যেহেতু রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেহেতু আমরা এ মামলার বিষয়ে কোনো আদেশ না দিয়ে তা কার্যতালিকা থেকে বাদ দিলাম।’ এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অমিত তালুকদার বলেন, ‘আপনারা মামলাটি শুনতে পারেন।’ এ পর্যায়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘আদেশ দেওয়া হয়ে গেছে। আমরা শুনব না। মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো।’
আদেশের পর তানভীরের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখতিয়ার থাকার পরও রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তিতে হাইকোর্ট মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। প্রতিবেদনে নতুন কিছুই নেই। তবে তানভীরের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট এর আগে যে আদেশ (আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি) দিয়েছিল, সেটি বহাল থাকবে। আমরা আজকের (গতকাল) এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করব।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছারাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। মামলাটি প্রথম তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) হয়ে তদন্তের দায়িত্ব নেয় র্যাব। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে এ পর্যন্ত ৭০ বারের মতো সময় নেওয়া হয়েছে বিচারিক আদালত থেকে।
এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ভবনের নিরাপত্তাকর্মীসহ বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল গ্রেপ্তার হলেও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া সাগর-রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান ২০১২ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জামিন পান। আসামি তানভীরের ক্ষেত্রে মামলা বাতিল ও অব্যাহতি চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হলে গত বছরের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্টের একই বেঞ্চ এক আদেশে মামলার তদন্তের সবশেষ অবস্থা ও অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কতটুকু সে বিষয়ে প্রতিবেদন আকারে জানাতে ৪ মার্চ পর্যন্ত সময় দেয়। পাশাপাশি তানভীরকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত।
