বিদেশগামী এবং অভ্যন্তরীণ আকাশপথের যাত্রীদের ওপর দুটি নতুন কর আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি নামে দুটি নতুন করের পরিমাণ অনুমোদন করেছে অর্থ বিভাগ। তার আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়।
সার্কভুক্ত দেশ ভ্রমণের সময় যাত্রীদের ৫ ডলার এবং সার্কভুক্ত দেশের বাইরে অন্যান্য দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১০ ডলার বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি পরিশোধ করতে হবে। একইভাবে সার্কভুক্ত দেশ ভ্রমণের সময় যাত্রীদের ৬ ডলার এবং অন্যান্য দেশ ভ্রমণের সময় ১০ ডলার যাত্রী নিরাপত্তা ফি দিতে হবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ যাত্রীদেরকেও এসব ফি পরিশোধ করতে হবে। দেশের ভেতরের বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি ১০০ টাকা এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ৯ শতাংশ মানুষ কর দেয়। অবশিষ্ট ৯১ শতাংশ কর দেয় না। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই দুটি কর আছে। আমরা যে করটা আরোপ করতে চাচ্ছি সেটা খুবই কম। আমরা হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে যেসব বিমানবন্দর বানাচ্ছি সেগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কয়েকটি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স থেকে যা পাই তা দিয়ে হয় না। আমাদের যেসব বিমানবন্দর রয়েছে সেগুলোর মধ্যে শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লাভজনক। বাকি সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর লোকসান দিচ্ছে। এমনকি চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরও লোকসান দিচ্ছে। চট্টগ্রামে একটি ডমেস্টিক ফ্লাইট নামলে দেয় ৫ হাজার টাকা। আন্তর্জাতিক একটা ফ্লাইট নামলে দেয় ৫ হাজার ডলার। চট্টগ্রামে হাতেগোনা কয়েকটি ফ্লাইট নামে। বিশাল ওই বিমানবন্দরে কয়েকশো লোক কাজ করে। যেহেতু সরকার কল্যাণমুখী তাই সরকারই এগুলো চালাবে। কিন্তু ব্যবহারকারীরা যদি খরচ না দেন সেগুলো সরকার কীভাবে চালাবে? করগুলো নতুন হলেও যত কম নেওয়া যায় ততটুকুই নির্ধারণ করা হয়েছে। করগুলো এখনো আরোপ করা হয়নি। আরোপ করার আগে আমরা আরও কথাবার্তা বলব।’
দেশের বিমানবন্দরগুলো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১৭ সালেই বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং যাত্রী নিরাপত্তা ফি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ফি নির্ধারণ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। কিন্তু নতুন কর নির্ধারণ করার বিষয়টি সামনে আসায় ধীরে-সুস্থে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবুল হাসনাত মো. জিয়াউল হককে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে। এই কমিটিও এসব কর নির্ধারণের সুপারিশ করে। এছাড়া বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গেও এ বিষয়ে মতবিনিময় করে সরকার। সেই মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও যোগ দিয়েছিলেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, সবাই আধুনিক বিমানবন্দর দেখতে চায়। বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রী সব সময়ই নিজ দেশের বিমানবন্দরকে অন্যান্য উন্নত দেশের বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনা করেন। তাই বিমানবন্দর উন্নয়ন সময়ের দাবি। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার দিকটিও দেখতে হবে। এসব কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকার দরকার। বিশে^র অন্যান্য দেশ এ খাতের উন্নয়নের জন্য যাত্রীদের করের টাকার ওপরই নির্ভর করে। মালদ্বীপ ২৫ ডলার, সিঙ্গাপুর ১৪ ডলার করে যাত্রীদের কাছ থেকে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি আদায় করে। ভারত যাত্রীপ্রতি ১০, যুক্তরাষ্ট্র ১৫, জার্মানি ১২ ও নেদারল্যান্ডস ১৬ ডলার যাত্রী নিরাপত্তা অর্থ আদায় করে। সেই টাকা দিয়ে এসব দেশের বিমানবন্দর যাত্রীদের নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের উন্নয়নের জন্য বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ায়। বেবিচক করের যে হার নির্ধারণ করেছিল তা কার্যকর করা হলে এই দুই খাত থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আয় হবে। এই টাকা দিয়ে বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে।
