মানবদেহে আয়োডিনের ঘাটতি মেটাতে ১৯৮৯ সাল থেকে লবণে আয়োডিন মিশ্রণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে সরকার। তিন দফায় নেওয়া আলাদা আলাদা প্রকল্পের ফলে ১৯৯৬ সালে আয়োডিন মিশ্রিত লবণ ব্যবহারের হার ৫৪ শতাংশ দাঁড়ায়। তবে ২০১৫ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আর কোনো জরিপও হয়নি। এখন ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্প নিতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এজন্য প্রকল্প প্রস্তাবে লবণে উৎপাদন বাড়াতে ও আয়োডিন মেশানো দেখতে ৪০ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের কথা বলা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, গত ২৯ বছর ধরে চলমান এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কি কোনো অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়নি?
যদিও বিসিক এর আগে বলেছিল, দেশে লবণের ঘাটতি নেই; বাড়তি লবণ নিয়ে কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি চাষিরা বিপাকে কারণ ন্যায্য দামে তারা লবণ বিক্রি করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বিসিক সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ তৈরি কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়োডিন ঘাটতি পূরণ শীর্ষক ওই প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
সম্প্রতি এ প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়। সভায় বিসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন। সভায় বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলে পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে জানা গেছে, লবণে আয়োডিন ঘাটতি মেটাতে ১৯৮৯ সাল থেকে তিন দফায় প্রকল্প নিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯৮৯ সালে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম প্রকল্প নেওয়া হয়। একই কাজে ২০০০ সালে ৬২ কোটি টাকা ও ২০১১ সালে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। তারপরও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এজন্য নতুন করে ১২৭ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে আয়োডিনজনিত সমস্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ, আয়োডিন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও লবণ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘লজিস্টিক সহায়তা’ দেবে বিসিক।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি চলতি বছর থেকে ২০২৩ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে জরিপ, মূল্যায়ন ও শিক্ষা বাবদ দুই কোটি ২১ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। লবণে আয়োডিনের মান পরীক্ষা, ‘টেস্টিং’ এবং ল্যাবের কেমিক্যাল কেনা বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা। মনিটরিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলের জন্য ধরা হয়েছে চার কোটি টাকা। প্রকল্পে বিদেশে শিক্ষা সফর বাবদ ২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪০ জন কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করবেন। ভ্রমণে বিসিক কর্মকর্তাদের সঙ্গী হবেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের লোকজনও। তবে তারা কোন দেশে যাবেন, তা ঠিক হয়নি। প্রকল্প অনুমোদনের পর তা চূড়ান্ত হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৯০টি খাতে আলাদা আলাদা বরাদ্দ চেয়েছে বিসিক। পিইসি সভায় এসব বরাদ্দ প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কারণ কমিশন মনে করে, প্রকল্পের অনেক কিছু এখতিয়ার বহির্ভূত, অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা সংশোধন করতে হবে। নইলে প্রকল্প পাস হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে লবণে আয়োডিন মিশ্রণ প্রক্রিয়ার এই ধারা অব্যাহত রাখা জরুরি। আমরা জনস্বার্থেই প্রকল্প হাতে নেই। তবে বিদেশ ভ্রমণসহ সব বিষয়েই আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এজন্য সামনা-সামনি বসে কথা বলতে হবে। ২৯ বছর ধর একাধিক প্রকল্প চালানোর পরও কেন কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতে হবে এবং কেনই বা শতভাগ লবণে আয়োডিন নেই- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার দরকার আছে। উন্নত প্রশিক্ষণ না পেলে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়বে কীভাবে? ২৯ বছর ধরে প্রকল্প চালিয়ে সফলতা কাক্সিক্ষত হারে কেন আসেনি, সেটা এই মুহূর্তে বলা যাবে না।
প্রস্তাবিত ডিপিপিতে লবণ চাষিদের জন্য ঋণ দেওয়ারও সংস্থান রাখতে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন জানায়, চাষিদের ঋণ দেওয়া বিসিকের কাজ নয়, প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে তা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। ডিপিপিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে ভোক্তাপর্যায়ে পর্যাপ্ত আয়োডিন মিশ্রিত লবণ ব্যবহারের হার ছিল ৫৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে এর হার ৫১ শতাংশে নেমে গেছে। এটি কীভাবে হলো তার ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন। কারণ লবণে আয়োডিন মিশ্রণ একটি রুটিন কাজ। দীর্ঘ ২৯ বছরেও টেকসই ভিত্তি তৈরি না করে আবারও চতুর্থ পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত তার ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যৌক্তিক নয় এবং অনাকাক্সিক্ষত। প্রকল্পের আওতায় আয়োডিন নিশ্চিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। আইনি ব্যয়ও ৩০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। যদিও লবণে আয়োডিনের মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার বিষয়টি সরকারের অন্য সংস্থা বিএসটিআইয়ের কাজ। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর এবং ক্যাব বাজার মনিটরিং করার জন্য কোর্ট পরিচালনা করে। প্রকল্পের আওতায় মোবাইল কোর্ট প্রয়োজন নেই। লবণে আয়োডিনের মান পরীক্ষার জন্য লবণও কেনা হবে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। ‘টেস্টিংয়ের’ জন্য ৪৪ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া লবণ পরীক্ষার জন্য ল্যাবের কেমিক্যালও কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭ লাখ টাকা। মনিটরিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলেরর জন্যও তিন কোটি ৯৭ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ডিপিপিতে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এই ব্যয় বহুমাত্রিক। কারণ লবণে আয়োডিনের মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার বিষয়টি বিএসটিআইয়ের। ফলে প্রয়োজন রয়েছে কিনা সেটা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকল্পে ৪০ জনের বিদেশ ভ্রমণে দুই কোটি টাকা, কনসালটেন্সির জন্য ছয় লাখ এবং জরিপ বা সার্ভেতে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা, ১৭টি ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সের জন্য এক কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় পিইসি সভায়। এছাড়া ৫৬৪টি অ্যাডভোকেসি এবং ওরিয়েন্টশনের জন্য প্রায় সাত কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ডিপিপিতে, যা ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সভায় বলা হয়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে প্রকল্পটি করা হলেও দেশের কোন কোন অঞ্চলে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার কম তার কোনো ডাটাবেজ বা তালিকা দেওয়া হয়নি। ২০১৫ সালের পরে কোনো জরিপও হয়নি। কাজেই কীভাবে এসব অঞ্চল চিহ্নিত করা হবে- তা পরিষ্কার নয়। আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশে এ প্রকল্প তৈরি করা হলেও তাদের সুপারিশে ল্যাবের যন্ত্রপাতি কেনা বা আধুনিকায়নের কোনো সুপারিশ না করে এ খাতে কোটি টাকারও বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে, যা বাদ দেওয়া দরকার বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, বিদেশ সফরসহ প্রকল্পের বেশ কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনী আনতে বলা হয়েছে। পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা অনুমোদনের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
